খুলনার জলাধার সংকট: অপরিকল্পিত নগরায়ণের ভয়াবহ পরিণতি
খুলনার জলাধার সংকট: অপরিকল্পিত নগরায়ণের ভয়াবহ পরিণতি

একসময়ের পুকুর, জলাশয় ও সবুজে ঘেরা খুলনা নগর আজ অপরিকল্পিত নগরায়ণের কবলে পড়ে এক তপ্ত কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। শহরের প্রবীণদের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বড় বড় পুকুর আর ডোবাগুলো আজ স্রেফ অতীত। রয়েল মোড়, জাতিসংঘ শিশুপার্ক, রেলস্টেশন কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—খুলনার আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পুকুর গিলে খেয়ে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, সিনেমা হল, মার্কেট ও আবাসিক প্রকল্প। আধুনিকতার নামে জলাধার ধ্বংসের এই মহোৎসব খুলনার জন্য এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

জলাধার হারানোর বহুমুখী প্রভাব

জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার চড়া মাশুল ইতিমধ্যেই দিতে শুরু করেছেন খুলনাবাসী। এর প্রভাব বহুমুখী ও দীর্ঘস্থায়ী। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, সামান্য বৃষ্টিতেই খুলনা নগরে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, শুষ্ক মৌসুমে চরম পানিসংকট দেখা দিচ্ছে শহরের অর্ধেক এলাকায়। ওয়াসার হিসাব বলছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর গড়ে ছয় ইঞ্চি নিচে নামছে। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি তোলার কারণে মাটির নিচে শূন্যস্থানে প্রবেশ করছে লবণাক্ত পানি।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ভয়াবহ চিত্র

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র হলো নগরের অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি। গত ৩০ বছরে খুলনার ভূমির তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর গাছপালা কমেছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। এরই চূড়ান্ত পরিণতি আমরা দেখেছি গত এপ্রিলে, যখন শহরের তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে গিয়ে ঠেকেছে। জলাধার ও সবুজ এলাকা কমার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব এই চরম তাপপ্রবাহ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইন থাকলেও কেন বন্ধ হয়নি জলাধার ভরাট?

প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ অনুযায়ী, যেকোনো পুকুর, দিঘি বা ডোবা ভরাট করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইন থাকা সত্ত্বেও একের পর এক পুকুর কীভাবে ভরাট হয়ে গেল? এ প্রশ্নের উত্তরে প্রশাসনের গাফিলতি ও উদাসীনতাই চোখে পড়ে। কেডিএ, কেসিসি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের চরম সমন্বয়হীনতা ও নীরবতার সুযোগ নিয়েছে প্রভাবশালী দখলদার ও জমি ব্যবসায়ীরা। কেডিএর তথ্যমতে, শত শত জলাশয় পুরোপুরি বা আংশিক ভরাট হয়েছে। হাতে গোনা যে কটি মামলা বা নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তা বিশাল অপরাধের তুলনায় অতি নগণ্য। বর্তমানে টিকে থাকা জলাশয়গুলোও হয় আবর্জনার ভাগাড়, নয়তো দখলদারদের হুমকিতে জর্জর।

সমাধানের পথ ও করণীয়

এই আত্মঘাতী ধারা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নগরের যেসব জলাশয় এখনো টিকে আছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা করে সংরক্ষণের কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দখল হওয়া সরকারি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পুকুর অবিলম্বে পুনরুদ্ধার করে সৌন্দর্যবর্ধন করতে হবে। জলাশয় ভরাটের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এই আগ্রাসন রোখা সম্ভব নয়। আগামী প্রজন্মকে একটি বাসযোগ্য, তাপ ঝুঁকিমুক্ত খুলনা উপহার দিতে হলে প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষা ও সবুজায়ন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করি, এই লক্ষ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ কালবিলম্ব না করে একযোগে কাজ করবে।

প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন

খুলনা

সম্পাদকীয়

খুলনা বিভাগ