পরিবেশ রক্ষায় চীনের উদ্যোগ: পরিত্যক্ত খনি থেকে সবুজ শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তর
চীনে পরিত্যক্ত খনি সবুজ শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তর

পরিবেশ রক্ষায় চীনের যুগান্তকারী উদ্যোগ: পরিত্যক্ত খনি থেকে সবুজ শিল্পকেন্দ্র

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে চীন তার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি বজায় রেখে চলেছে। দেশটির হুবেই প্রদেশের তাইয়্য শহরে একটি অভিনব প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, যেখানে পরিত্যক্ত খনি এলাকাগুলোকে সবুজ জ্বালানি উৎপাদন ও টেকসই শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখা যাচ্ছে সোংওয়ান গ্রামে, যা একসময় খনির কার্যক্রমে ক্ষতবিক্ষত ছিল।

ধুলা ও দূষণ থেকে সবুজ বিপ্লব

সোংওয়ান গ্রামটি অতীতে প্রায় ৫০০টি সক্রিয় খনির কারণে ধুলা ও কাদায় ভরা একটি অঞ্চল ছিল। গ্রামজুড়ে বাতাসে ধুলার স্তর জমে থাকত এবং অতিরিক্ত খনন এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ২০০৮ সালে দায়ে শহরকে ‘সম্পদ-শূন্য শহর’ ঘোষণা করা হয়েছিল, যা স্থানীয়দের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। গ্রামটির কাছে অবস্থিত পরিত্যক্ত বাওশেং খনিকে একটি আধুনিক হাইড্রোজেন উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্রকল্পে খনির জমিতে পাহাড়ের ঢালে সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে, পরিত্যক্ত সুড়ঙ্গকে হাইড্রোজেন সংরক্ষণের গুহা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সমতল জমিতে উৎপাদন কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকল্পের বিস্তারিত ও প্রযুক্তিগত সাফল্য

২০২৩ সালের মার্চে ১৭ কোটি ৮০ লাখ ইউয়ান বিনিয়োগে এই প্রকল্পটি শুরু হয় এবং ২০২৪ সালের এপ্রিলে উৎপাদন কার্যক্রম চালু করে। ২০২৫ সালে প্রকল্পটি প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, যা বছরে প্রায় দেড় হাজার টন হাইড্রোজেন উৎপাদন সম্ভব করেছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে এই উদ্যোগ, যার বার্ষিক উৎপাদনমূল্য প্রায় ২০০ কোটি ইউয়ান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ছিল খনির ভেতর নিরাপদে হাইড্রোজেন সংরক্ষণ করা। এই সমস্যা সমাধানে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ চীনের বিজ্ঞান একাডেমির গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে এশিয়ার প্রথম ‘রক ক্যাভার্ন হাইড্রোজেন স্টোরেজ’ পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এতে ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, নতুন শক্তিশালী উপাদান এবং ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্থানীয় উন্নয়ন ও অন্যান্য প্রকল্প

এই প্রকল্পের ফলে গ্রামের পরিবেশ যেমন বদলেছে, তেমনি মানুষের জীবনযাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। অনেক নারী এখন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা অন্যান্য কাজে নিয়োজিত হয়ে ভালো আয় করছেন। গ্রামটির প্রধান সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে, নদী পরিষ্কার করা হয়েছে এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।

একই ধরনের পুনর্বাসন প্রকল্প দায়ে শহরের পিংশান গ্রামেও বাস্তবায়িত হয়েছে। সেখানে একটি বড় পাথরের খনিকে শিল্পকারখানার জন্য ব্যবহারযোগ্য জমিতে পরিণত করা হয়েছে। ৫৬ কোটি ইউয়ান বিনিয়োগে সেখানকার খনি এলাকার সাড়ে ১৮ হেক্টর জুড়ে একটি সার উৎপাদন কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে, যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা আট লাখ টন।

দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ সংরক্ষণ প্রচেষ্টা

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০১২ সাল থেকে দায়ে শহরে ৫০০টির বেশি খনি ও বর্জ্যভান্ডার বন্ধ করা হয়েছে এবং ৭০টির বেশি খনি এলাকা পুনর্বাসন করা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, একসময় ধুলা ও দূষণে ভরা এই অঞ্চল এখন অনেকটাই বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। নতুন প্রকল্পগুলো শুধু পরিবেশ পুনরুদ্ধারই করছে না, বরং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগও তৈরি করছে।

চীনের এই উদ্যোগ পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী অন্যান্য দেশের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে।