আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত: পৃথিবীকে শীতল করার আশ্চর্য প্রক্রিয়া ও তার সীমাবদ্ধতা
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত: পৃথিবী শীতল করার প্রক্রিয়া

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত: পৃথিবীকে শীতল করার আশ্চর্য প্রক্রিয়া

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বলতে আমরা সাধারণত উচ্চ তাপমাত্রার লাভা এবং ধ্বংসযজ্ঞকে বুঝে থাকি। কিন্তু এই অগ্ন্যুৎপাতের সময় বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে সালফার ডাই-অক্সাইড গ্যাস এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণা নির্গত হয়, যা আশ্চর্যজনকভাবে পৃথিবীকে শীতল করতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়াটি অনেক সময় আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়, কিন্তু এর প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।

প্যারাসোল ইফেক্ট: কীভাবে কাজ করে এই শীতলীকরণ প্রক্রিয়া?

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সালফার ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তর বা স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে প্রবেশ করে। সেখানে এটি জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অতি ক্ষুদ্র সালফিউরিক অ্যাসিডের তরল ফোঁটায় পরিণত হয়। এই ফোঁটাগুলো মহাকাশে একটি বিশাল আয়নার মতো কাজ করে, সূর্যের তাপ মহাকাশে প্রতিফলিত করে পাঠিয়ে দেয়। একে বিজ্ঞানীরা প্যারাসোল ইফেক্ট বলে থাকেন। এর ফলে সূর্যের তেজ সরাসরি ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে না এবং কয়েক বছর পর্যন্ত পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা কম থাকে।

ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ: মাউন্ট পিনাতুবো ও মাউন্ট তামবোরা

ফিলিপাইনের মাউন্ট পিনাতুবোর অগ্ন্যুৎপাত বিজ্ঞানীদের এই প্রক্রিয়া বুঝতে দারুণভাবে সাহায্য করেছিল। সে সময় ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন টন সালফার ডাই-অক্সাইড স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ছড়িয়ে পড়েছিল। এর প্রভাবে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গিয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট তামবোরার অগ্ন্যুৎপাত ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় শীতলীকরণের ঘটনা। এর ফলে উৎপন্ন অ্যারোসল বায়ুমণ্ডলে এমন এক আগ্নেয় শীত তৈরি করেছিল, যার প্রভাবে ১৮১৬ সালে উত্তর গোলার্ধে কোনো গ্রীষ্মকাল আসেনি। ইতিহাসে একে গ্রীষ্মবিহীন বছর বলা হয়। সে বছর জুলাই মাসেও নিউ ইংল্যান্ডে তুষারপাত হয়েছিল এবং ইউরোপে শস্যহানি ও দুর্ভিক্ষের মতো বিপর্যয় নেমে এসেছিল।

আগ্নেয়গিরি কি বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধ করতে পারে?

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আগ্নেয়গিরি যদি পৃথিবীকে শীতলই করে, তবে কি এটি গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব বা বিশ্ব উষ্ণায়ন রুখে দিতে পারবে? বিজ্ঞানীদের ধারণা, এমনটা সম্ভব নয়। এর কারণগুলো নিম্নরূপ:

  • আগ্নেয়গিরি থেকে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়, মানুষের তৈরি কলকারখানা ও যানবাহনের নির্গত ধোঁয়ার তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য।
  • আগ্নেয়গিরি বছরে ০.১৩ থেকে ০.৪৪ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে, যা মানুষের তৈরি নির্গমনের মাত্র কয়েক দিনের সমান।
  • আগ্নেয়গিরির সালফার অ্যারোসল বায়ুমণ্ডলে মাত্র এক থেকে তিন বছর থাকে এবং বৃষ্টির মাধ্যমে নিচে নেমে আসে। কিন্তু মানুষের তৈরি গ্রিনহাউস গ্যাস শত শত বছর বায়ুমণ্ডলে থেকে যায়।

তাই আগ্নেয়গিরির প্রাকৃতিক এসি সাময়িকভাবে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন রোধে তা যথেষ্ট নয়। এই বিষয়টি জলবায়ু বিজ্ঞানীদের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।