পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিপুল পরিমাণ ব্যবহৃত ইহরামের কাপড় উদ্বৃত্ত থাকে। সৌদি আরব সেই কাপড়কে বর্জ্যে পরিণত না করে পরিবেশবান্ধব সম্পদে রূপান্তরের একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে। 'টেকসই ইহরাম' নামের এই প্রকল্পের আওতায় গত এক বছরে হাজিদের ব্যবহৃত ইহরামের কাপড় পুনর্ব্যবহার করে ৫ হাজারেরও বেশি নতুন পণ্য তৈরি করা হয়েছে।
সৌদি ভিশন ২০৩০-এর অংশ
সৌদি আরবের জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের মুখপাত্র সুলতান আল-হার্থি জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ সৌদি ভিশন ২০৩০-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে জাতীয় রূপান্তর কর্মসূচি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে এটি সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইহরামের তাৎপর্য
ইহরামের সাদা কাপড় ইসলামে সাম্য, পবিত্রতা ও বিনয়ের প্রতীক। হজ পালনকালে পুরুষ হাজিদের জন্য সেলাইবিহীন দুটি সাদা সুতি কাপড় পরিধান করা আবশ্যক, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সব বিভেদ মুছে দিয়ে সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করায়। হজের নিয়ম অনুযায়ী ১০ জিলহজ জামারাতে পাথর নিক্ষেপ ও চুল কাটার পর হাজিরা প্রথম ধাপে ইহরামের অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর তাওয়াফে ইফাদাহ সম্পন্ন করে তারা স্বাভাবিক পোশাকে ফিরে যান, ফলে বিপুল পরিমাণ ইহরামের কাপড় উদ্বৃত্ত হয়।
প্রকল্পের বহুমুখী সুফল
সুলতান আল-হার্থি বলেন, এই প্রকল্প শুধু পরিবেশ সংরক্ষণেই অবদান রাখছে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে এবং অলাভজনক খাতের বিকাশে সহায়তা করছে। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী পরিবারের নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি হাজিদের সেবার মানও উন্নত হয়েছে।
প্রকল্পটির অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুফল তুলে ধরে তিনি জানান, ফেলে দেওয়া ইহরামের কাপড় ব্যবহার করে ৫ হাজারের বেশি পণ্য তৈরি করায় পরিবহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে ৩০টি খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং ২৫ জন প্রান্তিক নারী দর্জি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এটি চক্রাকার অর্থনীতির (Circular Economy) একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিবেশগত সাফল্য
পরিবেশগত দিক থেকেও প্রকল্পটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে ২১১ টনের বেশি কাপড়ের বর্জ্য ল্যান্ডফিলে জমা হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে, যা হজ মৌসুমে কার্বন নিঃসরণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ হাজি পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়েছেন।
বাস্তবায়ন পদ্ধতি
প্রকল্পের বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে আল-হার্থি জানান, প্রথমে পবিত্র স্থানগুলোতে স্থাপিত নির্দিষ্ট বুথ থেকে ব্যবহৃত ইহরামের কাপড় সংগ্রহ করা হয়। এরপর কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাপড়গুলো নির্বাচন করে আধুনিক প্রযুক্তিতে জীবাণুমুক্ত করা হয়, যাতে কোনো ময়লা বা ত্রুটি না থাকে। শতভাগ স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পর সেগুলো দিয়ে নতুন পণ্য উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে এসব কাপড় ব্যবহার করে আকর্ষণীয় ব্যাগ, বালিশ, বিভিন্ন ধরনের কভার ও উপহারসামগ্রী তৈরি করা হচ্ছে।
যৌথ অংশীদারিত্ব
এই প্রকল্পের সাফল্যের পেছনে সরকারি, বেসরকারি ও অলাভজনক খাতের ২২টি প্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশীদারিত্বকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আল-হার্থি। তিনি জানান, প্রতি বছর হাজিদের মধ্যে ব্যবহৃত ইহরামের কাপড় দান করার প্রবণতা বাড়ছে, যা পরিবেশ সচেতনতার ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
শুধু ইহরামের কাপড় পুনর্ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয় সৌদির পরিকল্পনা। জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র হজের সময় উদ্বৃত্ত খাবারকে জৈব সারে রূপান্তরের কাজও করছে। ভবিষ্যতে এই সফল মডেলটি সৌদি আরবের অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পেও প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে আরও টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি।



