পাপুয়া নিউগিনির নিউ আয়ারল্যান্ড উপকূলের কিছু অংশে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশটির সরকার। সেখানকার পানির প্রাথমিক পরীক্ষায় ক্ষতিকর ধাতব পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর আগে কয়েক মাস ধরে ওই এলাকার বাসিন্দারা সমুদ্রের পাড়ে একের পর এক মৃত সামুদ্রিক প্রাণী ভেসে আসতে দেখছিলেন।
প্রাথমিক পরীক্ষায় মিলল ক্ষতিকর ধাতব পদার্থ
৭ মে দেশের মৎস্যমন্ত্রী জেলটা ওং জানান, একটি স্বাধীন সংস্থা ওই এলাকার পানি পরীক্ষা করেছে। পূর্ব পাপুয়া নিউগিনির দ্বীপ নিউ আয়ারল্যান্ডের কাফকাফ গ্রাম ও লারাইরু লেগুনের আশেপাশের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে পানির নমুনা নেওয়া হয়েছিল। সেই প্রাথমিক পরীক্ষায় পানিতে বিভিন্ন ধাতব পদার্থ শনাক্ত হয়েছে।
একটি সংবাদ সম্মেলনে মৎস্যমন্ত্রী ওং বলেন, এই পরীক্ষার ফলাফল থেকে বোঝা যাচ্ছে যে সামুদ্রিক পরিবেশে বিষাক্ত খনিজ পদার্থ মিশে গেছে। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
সমস্যার সূত্রপাত ডিসেম্বরে
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই এলাকায় প্রথম সমস্যা দেখা দেয়। তখন নিউ আয়ারল্যান্ডের উপকূলের বাসিন্দারা সমুদ্রের তীরে অস্বাভাবিক সংখ্যায় মৃত মাছ ভেসে আসতে দেখেন। এই ঘটনায় কাফকাফ ও মাঙ্গাই নামের দুটি এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
স্থানীয়দের জীবনযাত্রায় প্রভাব
নিউ আয়ারল্যান্ডের মানুষ সাধারণত নিজেদের খাওয়ার জন্য ও বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে সমুদ্রে মাছ ধরেন। আইলান অ্যাওয়ারনেস নামের একটি স্বাধীন পরিবেশ সংস্থা এই এলাকায় পাঁচ দিন ধরে একটি জরিপ চালিয়েছে। এই জরিপে তারা অন্তত ১৫টি প্রজাতির ৩ হাজার ৪০০–এর বেশি মৃত সামুদ্রিক জীব খুঁজে পায়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিষাক্ত মাছ খাওয়া অথবা দূষিত পানির কারণে অন্তত ১১টি গ্রাম ও ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি মানুষ অসুস্থ বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অগভীর সমুদ্রের প্রবাল প্রাচীরে মাছগুলোকে মৃত অবস্থায় ভাসতে দেখা গেছে। এই মাছগুলোর চোখ ফোলা ছিল, চামড়া নষ্ট হয়ে গিয়েছিল ও মাংসের রং বদলে গিয়েছিল। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মৃত সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে খাবার ও আয়ের জন্য সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় মানুষজন ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে পড়েন।
শারীরিক সমস্যা ও পানির গন্ধ
কিছু বাসিন্দা দূষিত পানিতে সাঁতার কাটার পর বা মাছ ধরার পর বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কথা জানিয়েছেন। স্থানীয় লোকজন জানান, সমুদ্রের পানি থেকে তীব্র সালফারের মতো গন্ধ বের হচ্ছে। এমনকি ভাটার সময় পানি অনেক ঘোলা ও বিবর্ণ দেখায়।
নিষেধাজ্ঞা ও তদন্ত
পুরো পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই এলাকার পানি থেকে ধরা মাছ বা যেকোনো সামুদ্রিক খাবার খেতে নিষেধ করেছে কর্তৃপক্ষ। তারা আরও জানিয়েছে, পানিতে পাওয়া ক্ষতিকর ধাতব পদার্থগুলো ঠিক কোথা থেকে এসেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দূষণের আসল কারণ ও মাত্রা জানার জন্য তদন্ত চলছে। নিউ আয়ারল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে কি না, তাও জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই কাজে দেশের বিভিন্ন জাতীয় সংস্থা, বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরিগুলো একসঙ্গে কাজ করছে।
পরিবেশগত বিপদ ঘোষণা
এর আগে গত জানুয়ারি মাসেও বাসিন্দারা সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু ও মানুষের অসুস্থ হওয়ার খবর দিতে থাকেন। এরপরই প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ কাফকাফ এলাকাকে পরিবেশগত বিপদ ও দূষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে।
নিউ আয়ারল্যান্ডের গভর্নর বায়রন চ্যান গত মার্চ মাসে সংসদে বলেন, এই মাছের রহস্যজনক মৃত্যু এখন একটি বড় পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জাতীয় সরকারের কাছে আহ্বান জানান। তবে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোতে দ্রুত পদক্ষেপ ও তাৎক্ষণিক সহায়তা না দেওয়ায় জাতীয় সরকার বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছে।
পরিবেশকর্মীর উদ্বেগ
সামুদ্রিক সংরক্ষণকর্মী জন আইনি বলেন, কর্তৃপক্ষের ধীরগতির কারণে ভুক্তভোগী মানুষজন প্রয়োজনীয় সাহায্য পাচ্ছেন না। তিনি এই পরিস্থিতিকে চরম অবহেলা বলে বর্ণনা করেন। সামুদ্রিক খাবার বিষাক্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে পরিবারগুলো এখন মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছে।
জন আইনি তখন সতর্ক করে বলেন, এত বিপুল সংখ্যক সামুদ্রিক জীবের মৃত্যু একটি বড় পরিবেশগত বিপর্যয়ের সংকেত। এটি প্রবাল প্রাচীর ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় স্থানীয় মানুষজন এখন তীব্র খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়েছেন। কারণ, তারা খাদ্য ও জীবিকার জন্য পুরোপুরি সমুদ্রের ওপরই নির্ভরশীল।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান



