রেহমান সোবহানের সতর্কবার্তা: সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বাধা ও ঋণখেলাপিদের ভূমিকা
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বাংলাদেশে সংস্কার প্রক্রিয়ার পথে ঋণখেলাপিদের রাজনৈতিক প্রভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে এবং সংস্কারের পথে তারা নিজেরাই বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে সমস্যাটি ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং কাঠামোগত।
সংস্কার শুধু আইন প্রণয়ন নয়, ধারাবাহিক প্রক্রিয়া
রেহমান সোবহান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিনে ‘সংস্কার নিয়ে মোহ: বাংলাদেশের গল্প’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংস্কার মানে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রথমে আইন হবে, তারপর তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এরপর হবে আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সবশেষে ফলাফল মূল্যায়ন।
রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের ভেতরে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রকৃত নেতৃত্ব বা অঙ্গীকার কতটা আছে, তা স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, অতীতে দেখা গেছে বড় ধরনের সংস্কার তখনই সফল হয়, যখন তা জনগণের মধ্যে শক্তিশালী সমর্থন পায়। উদাহরণ হিসেবে ছয় দফা আন্দোলনের কথা বলা যায়, যা একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে জনগণের কাছে পৌঁছেছিল এবং ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল।
বর্তমানে ছয় দফার মতো গণভিত্তিক প্রচার খুবই দুর্বল, এমন মন্তব্য করে রেহমান সোবহান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার জনগণের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি দলের অনেক সদস্যই নিজেদের ইশতেহারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন না।
সরকারি অভিজ্ঞতা ছাড়া সংস্কার বোঝা কঠিন
আলোচকদের মধ্যে কতজন বাস্তবে সরকারে কাজ করেছেন বা সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, এই অভিজ্ঞতা না থাকলে সংস্কারের প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন। কে সংস্কার চান, কে এর বিরোধিতা করেন এবং কেন অনেক সময় সংস্কার সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় না—সরকারে কাজ না করলে তা অনেক সময় বোঝা যায় না।
অনেকের কাছে সংস্কারকে তাত্ত্বিক বা কেতাবি আলোচনার বিষয়বস্তু বলেও মনে করেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, ‘আমি যখন পরিকল্পনা কমিশনে কাজ করতাম, তখন আমার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। সেখানে দেখেছি যে সংস্কারকে আইন হিসেবে পাস করানো সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়, আসল সমস্যা হলো সেটিকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।’
পুলিশ সংস্কারের উদাহরণ: বাস্তব ফলাফলই মূল পরীক্ষা
পুলিশ সংস্কারকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে রেহমান সোবহান বলেন, সংস্কারের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব, যখন তা বাস্তবে ফল দিতে শুরু করে। যদি বলা হয় যে পুলিশকে জবাবদিহিমূলক করা হবে এবং তারা বাধ্যতামূলকভাবে অভিযোগ গ্রহণ করবে, তাহলে কয়েক বছর পর বাস্তবে কী হচ্ছে, তা পরীক্ষা করা উচিত। সাংবাদিকেরা থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করে দেখুক—পুলিশ কতটা সহজে তা গ্রহণ করছে। এটাই হবে সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব: বাস্তবায়নে ঘাটতি
বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে আসা সংস্কার প্রস্তাবগুলো নতুন কিছু নয় মন্তব্য করে রেহমান সোবহান বলেন, এগুলো নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে, বিভিন্ন সরকারের সময় বাস্তবায়নের চেষ্টাও করা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘বাস্তবে কী হয়? সরকারগুলো প্রথমে কিছুটা অগ্রগতি দেখায়। কারণ তারা অর্থসহায়তার কিস্তি পেতে চায়। একইভাবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোরও স্বার্থ থাকে—তারা তাদের অর্থ বিতরণ করতে চায়।
বিচার বিভাগীয় সংস্কারের উদাহরণ দিয়ে রেহমান সোবহান ১৯৯০-এর দশকে এ বিষয়ে বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে স্মৃতিচারো করেন। তিনি বলেন, ‘একই সময়ে বাজেট সংস্কারের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী কাজ করেছিল। কিন্তু আমরা যদি বিচার বিভাগের বর্তমান অবস্থা দেখি, তাহলে স্পষ্ট হয় যে সেসব প্রচেষ্টার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব খুবই সীমিত। একইভাবে বাজেট ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার অর্থাৎ রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটের একীভূতকরণ নিয়ে দশকের পর দশক ধরে আলোচনায় থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।’
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উদাহরণও দেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, প্রতিবছরই দেখা যায় যে এই খাতগুলোতে বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না। অথচ একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠে যে এই খাতগুলোতে বরাদ্দ কম। তাঁর প্রশ্ন, বরাদ্দের অর্থ ঠিকভাবে ব্যবহার না হলে সমস্যাটা তাহলে কোথায়? কেন এই খাতে কার্যকর ব্যয় হচ্ছে না, এ নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ খুব কমই দেখা যায়। অথচ জনগণ নিম্নমানের স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে এবং শিক্ষার মান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। তিনি বলেন, পরীক্ষার ফলাফল ভালো হলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। এখানেই মূল সমস্যা। রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে কাজ করছে, সেটাই মূল প্রশ্ন।
ভারতের অভিজ্ঞতা: নাগরিক আন্দোলনের শক্তি
ভারতের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে রেহমান সোবহান বলেন, ‘সেখানে খাদ্যের অধিকার, শিক্ষার অধিকার বা কাজের অধিকার—এসব বড় সংস্কার এসেছে শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন এবং বিভক্ত। বড় কোনো সংস্কারের পক্ষে আমরা ঐক্যবদ্ধ চাপ তৈরি করতে পারছি না।’
বিরোধী দলের ভূমিকা ও জবাবদিহির গুরুত্ব
সংস্কারের জন্য বিরোধী দলের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, বিরোধী দলের উচিত শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা না করে সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর নজর রাখা এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অন্যদিকে সরকার সত্যিকার অর্থে সংস্কার চাইলে তাদের নিজেদের মধ্যেই জবাবদিহির একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু নীতি ঘোষণা করলেই হবে না, সেগুলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা থাকতে হবে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া: সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই হচ্ছে সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা, এমন আখ্যা দিয়ে রেহমান সোবহান অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনব্যবস্থার পক্ষে জোর দেন। তিনি বলেন, একটি সরকার তখনই প্রকৃত অর্থে জবাবদিহিমূলক হয়, যখন তারা তাদের কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে জনগণের রায় গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ ধরনের উদাহরণ খুবই সীমিত। এ বিষয়ে ২০০১ সালে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, যত দিন না এই ধরনের জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তত দিন সংস্কার বাস্তবায়নের পথ কঠিনই থেকে যাবে।



