বড় চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন সরকার: অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানোই এখন প্রধান লক্ষ্য
নতুন সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: স্থিতিশীলতা ফেরানো জরুরি

বড় চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন সরকার: অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানোই এখন প্রধান লক্ষ্য

টানা তিন বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে, বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল হয়ে পড়েছে, এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। এ অবস্থায় নতুন সরকার অর্থনীতির দায়িত্ব নিয়েছে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যেই। দেশের আর্থিক খাত সংকটে রয়েছে, কয়েকটি ব্যাংক চালু রাখতে সরকারকে তারল্যসহায়তা দিতে হচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়ে গেছে, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: প্রথম অগ্রাধিকার

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। এর অর্থ আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি বাড়ছে, ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে বাজারে সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা ব্যবসা ও শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন অগ্রাধিকার, কারণ তা না হলে অর্থনীতি টেকসই হবে না।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ সংকট

অর্থনীতি নিয়ে সরকার এখন উভয়সংকটে: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নাকি বেকারত্ব কমানো। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছেছেন, কিন্তু এ সময়ে শ্রমবাজারে নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। বিনিয়োগের দুরবস্থা করোনা মহামারির সময়েও দেখা যায়নি, এবং জ্বালানিসহ অবকাঠামোগত সমস্যা ও আস্থাহীনতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগ বাড়ানো এবং একটি আস্থাপূর্ণ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য বৃদ্ধি

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কমে যাওয়া বাস্তব আয়ের কারণে দারিদ্র্যের হার আবার বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার এখন ২১ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। আয়বৈষম্যও উদ্বেগজনক: বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, জিনি অনুপাত ২০২২ সালে ০.৪৯৯ হয়েছে, যা উচ্চ মাত্রার বৈষম্য নির্দেশ করে। দেশের মোট আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ এখন শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে, এবং প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।

ব্যাংক খাত ও জ্বালানি ঝুঁকি

ব্যাংক খাত এখন বড় উদ্বেগের জায়গা: খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্বল তদারকি এই সংকটকে তীব্র করেছে। জ্বালানি খাতও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে: ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়াতে পারে, টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, এবং মূল্যস্ফীতি আবার উসকে দিতে পারে।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কৌশল

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে, আস্থা পুনরুদ্ধার করতে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং অর্থনীতিকে আরও টেকসই রাখতে একটি সুসংগঠিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কৌশল দরকার। এর সঙ্গে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, বিশেষ করে ব্যাংক খাত ও রাজস্ব প্রশাসনে। নতুন সরকারের জন্য ইরান যুদ্ধ একটি বাহ্যিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা জ্বালানি দাম, রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও চলতি হিসাবের ঘাটতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, নতুন সরকার কীভাবে বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ভাগ্য। স্থিতিশীলতা ফেরানো এখনই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথ সুগম হয়।