অর্থমন্ত্রীর সংসদে বক্তব্য: বিএনপি সরকারের আমলে অর্থনীতির চরম অবনতি
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ শুক্রবার জাতীয় সংসদে একটি বিবৃতিতে বলেছেন, বিএনপির নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই চাপের মধ্যে রয়েছে। জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল ১০টায় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে দিনের কার্যসূচিতে যাওয়ার শুরুতে মন্ত্রী এই বিবৃতি প্রদান করেন।
অর্থনৈতিক সূচকগুলোর মারাত্মক অবনতি
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকার সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করানোর পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়েছে। তিনি বলেন, বিগত বিএনপি সরকার অর্থনীতির মূল সূচকগুলো যেখানে ইতিবাচক ধারায় নিয়ে এসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে গিয়েছিল, বিগত ১৬ বছরে তা অনেকটাই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
সরকারি তথ্য তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে—৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। পরবর্তীতে দুর্বৃত্তায়ন ও ভ্রান্ত নীতির কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ শেষে প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ হয় এবং মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নেমে আসে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশে। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা কমে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে আসে।
কর্মসংস্থান সংকট ও টাকার অবমূল্যায়ন
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি অর্থনীতি যখন শিল্পের চালিকা শক্তি হারিয়ে ফেলে তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। বিগত সময়ে এটি চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিগত এক দশকে দেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাতের মধ্যে কৃষিতে মূল্য সংযোজনের অংশ কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ, অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বেড়েছে। কিন্তু সেই সময়ে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ, শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, গত ১৫ বছরে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৮.২ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ছিল ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১২১ টাকা। ক্রমাগত অবমূল্যায়নের কারণে গত ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে, ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিপজ্জনক পরিস্থিতি
ব্যাংক খাতের ‘বিপজ্জনক’ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে ২০ শতাংশ ছাড়িয়েছে (বাস্তবে ৩০ শতাংশ) এবং মূলধন পর্যাপ্ততা নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে। তাঁর ভাষায়, ‘অনেক ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পরিচালিত হয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১৩ গুণ, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যা ছিল ৮৫ বিলিয়ন টাকা, সেটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ১৪৭ বিলিয়ন টাকা হয়েছে, যা বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে এবং উন্নয়ন ব্যয় সীমিত করছে।
বৈষম্য বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা
আয়ের বৈষম্য ভয়াবহভাবে বেড়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০০৫ সালে ধনী-গরিব আয়ের পার্থক্য ৩৫ গুণ ছিল, ২০২২ সালে তা ৮১ গুণে পৌঁছেছে, এর ফলে একটি বৈষম্যমূলক সমাজ তৈরি হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিগত সময়ে প্রশাসন দলীয়করণ হয়েছে, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত দুর্বল হয়েছে এবং পরিসংখ্যান ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, ফলে সঠিক নীতি নির্ধারণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ভবিষ্যতের লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং এর জন্য নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু উদ্যোগ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে, ফলে সরকারকে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে, যা বাজেট ও রিজার্ভ—দুটির ওপরই চাপ তৈরি করবে।
তিনি স্বীকার করেন যে, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো গভীর ও বহুমাত্রিক, তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সুশাসন, সংস্কার ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপন ও নানামুখী চাপ মোকাবেলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার।



