মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় সরকারের ব্যয় সংকোচন
সরকারের ব্যয় সংকোচন: বিদেশ ভ্রমণ ও গাড়ি ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় সরকারের ব্যয় সংকোচন

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় সরকার কঠোর ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে। এর অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ, নতুন গাড়ি ক্রয় এবং কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে রবিবার (৫ এপ্রিল) একটি জরুরি পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।

পরিপত্রের মূল নির্দেশনাসমূহ

অর্থ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন সই করা পরিপত্র জারির দিন থেকেই নির্দেশনাগুলো কার্যকর হয়েছে। পরিপত্রে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্দেশনাটি সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

পুরোপুরি বন্ধ থাকবে যেসব ব্যয়

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। একইসঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নতুন মোটরযান, জলযান ও আকাশযান ক্রয়ও স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণ সুবিধাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিচালন বাজেটের আওতায় নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ এবং কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্ধেক বরাদ্দ ব্যবহারের নির্দেশ

কিছু খাতে বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি দফতরের আপ্যায়ন ব্যয়, মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন নির্মাণ এবং কার্যালয়ের শোভাবর্ধন কাজ। তবে, সরকারি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোর ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের এই সীমা প্রযোজ্য হবে না। আর যেসব নির্মাণ প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করা যাবে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে কড়াকড়ি

জ্বালানি সংকটের সম্ভাবনা বিবেচনায় বিদ্যুৎ, গ্যাস, পেট্রোল ও লুব্রিকেন্ট খাতে বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ ব্যয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সীমা সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। পরিপত্রে সতর্ক করে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় করা হলে ভবিষ্যতে সেই অর্থের কোনও বকেয়া দাবি গ্রহণ করা হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিষয়টি নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতি এখনও খুব শক্তিশালী নয়। আমদানির জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রাও নেই। ফলে সরকার সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে।” তিনি আরও বলেন, “কৃচ্ছতাসাধনের মাধ্যমে কিছু অর্থ সাশ্রয় হলে তা সামাজিক খাতে ব্যয় করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রেও বাড়তি অর্থের প্রয়োজন রয়েছে।”

সিপিডির গবেষণা পরিচালকের মতে, স্বল্পমেয়াদী ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগও নিতে হবে। বিশেষ করে কৃষিখাতে সোলার সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং সরকারি ক্রয়ে জ্বালানি সাশ্রয়ী যানবাহনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এই পদক্ষেপগুলো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।