নতুন পে স্কেল নির্ধারণে নিজস্ব কমিশন গঠনের পরামর্শ
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য নতুন পে স্কেল নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বর্তমান সরকারের নিজস্ব কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগের সরকারের প্রস্তাবিত পে কমিশনের রিপোর্টকে সরাসরি গ্রহণ না করে তা একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মেলনকেন্দ্রে ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের জন্য ভাবনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রলম্বিত দায় এড়াতে নতুন কমিশন
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, বিগত সরকার তাদের মেয়াদের শেষ সময়ে পে স্কেল সংক্রান্ত যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে এক ধরনের ‘প্রলম্বিত দায়’ তৈরি হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সরকারের নিজের মতো কমিশন গঠন করে এটাকে বিবেচনা করা উচিত, যেখানে আগের সরকারের পে কমিশনের রিপোর্টটি শুধুমাত্র একটি উপাদান হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার তাগিদ
পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানোর ওপর জোর দিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘চুরি করা টাকা ফেরত আনতে হবে। দেশের ভেতরে ও বাইরে যেসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, সেগুলো দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে অর্থ দেশে আনতে হবে। ছোট অঙ্কের টাকা ফিরছে, কিন্তু বড় অঙ্কের টাকা কেন আসছে না, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’
কঠোর আর্থিক বাজেটের পরামর্শ
আগামী অর্থবছরের জন্য নতুন সরকারকে কঠোর আর্থিক বাজেট করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে অতিরিক্ত ব্যয় করার জন্য নতুন সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যও চাপে রয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা আগের আর্থিক দুর্বলতাগুলোকে প্রকট করেছে। সে জন্য কঠোর আর্থিক বাজেট করতে হবে এবং সরকারকে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নির্দয় হতেই হবে।
স্বল্পমেয়াদি রূপরেখা ও ভর্তুকি সামঞ্জস্য
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারকে স্বল্পমেয়াদি রূপরেখা দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, খুব দ্রুত সময়ে সরকারকে তিন-চার মাসের জন্য একটি রূপরেখা দেওয়া দরকার। এটিকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে তিন বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি বাজেটকাঠামো করা যেতে পারে। সরকারের ব্যয় কমাতে ভর্তুকি সামঞ্জস্য করার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ভর্তুকির মধ্যে কোনো অন্যায্য আছে কি না, সেটি দেখতে হবে। অর্থাৎ, ভর্তুকির সুবিধা দরিদ্র নাকি ধনী মানুষ পাচ্ছেন, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। নগদ প্রণোদনা দুই-তিন ধাপে কমিয়ে আনতে হবে।
এডিপি পর্যালোচনা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি
বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) পর্যালোচনার জন্য টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, কাজটি এক-দেড় মাসের মধ্যে করতে হবে। এডিপি পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করতে হবে। এটি না করে আগের মতো প্রকল্প নিলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। রাজস্ব আয়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়, সেটি যে অর্জিত হবে না, এনবিআরও (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) জানে। তাই রাজস্ব আয়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। তাতে বাজেটের আকার আগের চেয়ে ছোট হলেও কাজটি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রশ্নের মুখে পড়লে তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, কর অবকাশের সুবিধা বাদ দিতে হবে। কর কমিয়ে করজাল বৃদ্ধি এবং কর আদায়ে ডিজিটালাইজেশন ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সম্পদের ওপর কর বসাতে হবে। এনবিআর দুই ভাগ করার প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করা দরকার বলে মত দেন তিনি। অনুষ্ঠানে সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান এবং জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নাজিবা মোহাম্মদ আলতাফসহ অন্যরাও উপস্থিত ছিলেন।



