রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, আট মাসে লক্ষ্য থেকে ৭১ হাজার কোটি টাকা কম
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৭১,৪৭২ কোটি টাকা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, এই ঘাটতি বছরের শেষে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
তিন প্রধান খাতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি
রাজস্ব আদায়ের তিনটি প্রধান খাতের কোনোটিতেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। আয়কর খাতে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা গেছে। এই খাতে আট মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা।
আমদানি শুল্ক খাতেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি। এই সময়ে ৮৯ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আদায় হয়েছে ৭১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। এতে ঘাটতি হয়েছে ১৭ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। একইভাবে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৪ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে ৯৭ হাজার ২৮২ কোটি টাকা।
বছরের শেষ চার মাসে বড় চ্যালেঞ্জ
এই পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরের শেষ চার মাসে রাজস্ব আদায়ে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫,৫৪০ কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা বাস্তবে কঠিন। কারণ চলতি অর্থবজারের কোনো মাসেই এত বেশি রাজস্ব আদায় হয়নি। জানুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ ৩,৭৩৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। আর সর্বনিম্ন আদায় হয়েছে আগস্ট মাসে, ২,৭২৫.৩ কোটি টাকা।
বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও প্রভাবক
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্য-বাণিজ্যে মন্দার কারণে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে রাজস্ব খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি পৃথক বিভাগ—রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গঠনের জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। তবে সেই কাঠামো এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। এনবিআরের একাংশ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর আপত্তির কারণে এ নিয়ে আন্দোলনও হয়েছে। ফলে নতুন সরকারের জন্য এটি আরেকটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও আন্তর্জাতিক চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ, কর জালের বাইরে থাকা করযোগ্য ব্যক্তিদের কর জালের আওতায় আনা, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পুরনো সমস্যাগুলো সমাধান না করে রাজস্ব ঘাটতি কমানো কঠিন হবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশকে প্রতি বছর জিডিপির কমপক্ষে ০.৫ শতাংশের সমতুল্য অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে হবে। এই আন্তর্জাতিক চাপও রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলছে।
সর্বোপরি, রাজস্ব আদায়ে এই বড় ঘাটতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন। সরকারের জন্য এখন জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মত দিয়েছেন।



