আইএমএফ ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ে আর্থিক খাত সংস্কারের রোডম্যাপ চূড়ান্তের অপেক্ষা
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, আর্থিক খাত সংস্কারের অগ্রগতি এবং নির্ধারিত শর্ত বাস্তবায়নের বাস্তব চিত্র মূল্যায়ন করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এ লক্ষ্যে সংস্থাটি বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কারের একটি সময়াবদ্ধ ও কাঠামোবদ্ধ নতুন রোডম্যাপ চেয়েছে, যা নতুন সরকারের কাছ থেকে লিখিতভাবে দাবি করা হয়েছে।
আগামী এপ্রিলে ওয়াশিংটনে বৈঠক ও মিশন সফরের প্রস্তুতি
বুধবার (২৫ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জি সাংবাদিকদের জানান, আগামী এপ্রিলে ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকের পর একটি পর্যালোচনা মিশন বাংলাদেশ সফর করবে। সেই সফরে ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে এবং এর ভিত্তিতে পরবর্তী কিস্তির অর্থ ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আলোচনা সফল হলে আগামী জুন নাগাদ বাংলাদেশ ঋণের পরবর্তী কিস্তির অর্থ পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য মিশন সফরকে সামনে রেখে আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আইএমএফের প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ সফরে আর্থিক খাত সংস্কারের অগ্রগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
নতুন সরকারের কাছে সংস্কারের রোডম্যাপ চাওয়া হয়েছে
আইএমএফের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নতুন সরকারের সময়ে কীভাবে বজায় রাখা হবে, তা জানতে চায় সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত ও সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ চাওয়া হয়েছে, যাতে সংস্কারের বিভিন্ন ধাপ, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং প্রত্যাশিত ফলাফল স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ও পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, "আইএমএফ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় বাজারভিত্তিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়া এবং আর্থিক খাত সংস্কারে নেওয়া উদ্যোগগুলোকে তারা ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছে।"
তিনি আরও বলেন, "আইএমএফ একটি সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ লিখিতভাবে দিতে বলেছে। সেই কাজ ইতোমধ্যে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক খাত সংস্কারের বিভিন্ন পদক্ষেপ বর্তমানে কোন পর্যায়ে আছে, সেটিও তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।"
আর্থিক খাত সংস্কারে জোর ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্ট’ বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিদের সামনে আর্থিক খাত সংস্কারের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন জোরদার, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ কমানো এবং আর্থিক খাতের তদারকি শক্তিশালী করার উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি দুর্বল বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। একই সঙ্গে একাধিক ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন চালিয়ে অনিয়ম ও দুর্বলতা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এখনও অন্তত ডজনখানেক ব্যাংক নানা সমস্যায় রয়েছে। এ কারণে ব্যাংকভিত্তিক পৃথক পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া আইএমএফের আগের শর্ত অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার যে পরিকল্পনা ছিল, বাস্তবে তা এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আর্থিক খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈদেশিক খাত ও রিজার্ভের চ্যালেঞ্জ এবং অতিরিক্ত অর্থায়নের সম্ভাবনা
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় বৈদেশিক খাতের পরিস্থিতিও গুরুত্ব পেয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার আইএমএফের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থায়নের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করা হতে পারে।
আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি ও বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে চাপ তৈরি হওয়ার পর ২০২২ সাল থেকে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়। ২০২৩ সালের শুরুতে সংস্থাটির সঙ্গে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। পরে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়।
- ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম কিস্তিতে ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পায় বাংলাদেশ।
- একই বছরের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তিতে আসে ৬৮ কোটি ২০ লাখ ডলার।
- ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি ডলার ছাড় করা হয়।
- পরবর্তীতে শর্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় চতুর্থ কিস্তি স্থগিত রাখা হয় এবং সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি একসঙ্গে ১৩৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার ছাড় করা হয়।
এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। ঋণ কর্মসূচির অধীনে এখনও ১৮৬ কোটি ডলার পাওনা রয়েছে। মূল সময়সূচি অনুযায়ী ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় হওয়ার কথা ছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। তবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শেষ না হওয়ায় সেই অর্থ ছাড় স্থগিত রাখা হয়।
বর্তমানে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মূল্যায়ন মিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই আগামী মাসগুলোর মধ্যে ঋণের অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কারের অগ্রগতি এবং নতুন রোডম্যাপের বাস্তবায়নই এই সিদ্ধান্তের মূল নির্ধারক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।



