আইএমএফের শর্ত পূরণে রাজস্ব ও ব্যাংক খাত পিছিয়ে, নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর শর্ত পূরণে বাংলাদেশের রাজস্ব খাত উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। সংস্কারের প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায়, রাজস্ব আদায় ও নীতিগত বিভাজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। করছাড় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি সীমিত, যা সার্বিক শুল্ক-কর আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে।
ব্যাংক খাতের সংস্কারেও বিলম্ব
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার সংক্রান্ত আইএমএফের বেশ কয়েকটি বড় শর্তও পূরণ হয়নি। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংসদে উত্থাপন এখনো বাকি রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে, নতুন সরকারের জন্য আইএমএফের নানা শর্ত পূরণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শুরু
এমন প্রেক্ষাপটে, গত মঙ্গলবার সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে নতুন সরকারের বৈঠক শুরু হয়েছে। প্রথম দিনে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের নেতৃত্বে আইএমএফ দল আলোচনা করেছে। এই বৈঠকগুলি ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি এবং শর্ত পূরণের সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
ঋণ কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি শুরু হয়। পরবর্তীতে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৩ সালের জুনে এটি ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। এখন পর্যন্ত, বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে, বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তি পাওয়ার কথা থাকলেও তা বিলম্বিত হয়েছে, এবং আগামী জুনে এটি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজস্ব খাতের সংস্কার সংক্রান্ত শর্ত
রাজস্ব ব্যবস্থা গতিশীল করতে আইএমএফ একাধিক শর্ত দিয়েছে, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি আলাদা বিভাগ তৈরি করা অন্যতম। গত বছর অধ্যাদেশ জারি করা হলেও, এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের কারণে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ডিসেম্বরের মধ্যে বিভাগ দুটি কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা থাকলেও, জনবল নিয়োগসহ অন্যান্য কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।
আইএমএফের আরেকটি শর্ত হলো সব ধরনের করছাড় বাতিল করা, যা তিন ধাপে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা। ইতিমধ্যে, তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের করছাড় বাতিল করা হয়েছে এবং বহু পণ্যে শুল্ক-কর সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে, আয়কর আইনের ৭৬(১) ধারা বাতিলের মাধ্যমে করছাড় দেওয়ার স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা বাতিলের শর্ত এখনো পূরণ হয়নি।
গত পাঁচ দশকে ২০০-এর বেশি প্রজ্ঞাপন দিয়ে বিভিন্ন খাতকে করছাড় দেওয়া হয়েছে। এনবিআরের একটি কমিটি গঠন করা হলেও, তার সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিল্প ও সেবা খাত বিকাশে করছাড় পুরোপুরি তুলে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
ভ্যাট হার ও পরিকল্পনা বিলম্ব
বাংলাদেশে বর্তমানে ১০টি ভ্যাট হার রয়েছে, যা আইএমএফের একক ভ্যাট হার করার চাপের মুখে রয়েছে। এনবিআর এখন একক ভ্যাট বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে কাজ শুরু করেছে। ভ্যাট ও আয়কর খাতে নিয়মকানুন পরিচালনের পরিকল্পনা ২০২৪ সালের জুন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত করার কথা ছিল, যা এখনো হয়নি। শুল্ক-কর আদায় বাড়ানোর মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরির কাজও বিলম্বিত হয়েছে, যদিও এটি চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
আইএমএফের শর্তে নতুন কাস্টমস আইন ও আয়কর আইন করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের শর্ত কোনো বছরই পূর্ণ হয়নি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংস্কার সংক্রান্ত শর্ত
ব্যাংক খাতেও আইএমএফের শর্ত পূরণে বিলম্ব দেখা দিয়েছে। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের শর্ত গত তিন বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসন ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করার কথা ছিল, যা আইএমএফের সহায়তায় প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে, জাতীয় সংসদ না থাকায় এটি পাস করা সম্ভব হয়নি।
অন্যান্য শর্তের অগ্রগতি
আইএমএফের নিজস্ব হিসাব পদ্ধতি অনুসারে, ক্রলিং পেগের মাধ্যমে বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং এটি সম্প্রসারণ করে চলমান রাখা হয়েছে। বিদেশি মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভের হিসাবও আইএমএফের পদ্ধতি অনুসারে করা হচ্ছে, পাশাপাশি সনাতনী পদ্ধতিতেও রিজার্ভ হিসাব করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, আইএমএফের শর্ত পূরণে বাংলাদেশের রাজস্ব ও ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়া ধীরগতির, যা নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আগামী দিনগুলিতে এই বিষয়গুলিতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।



