এনবিআরের ডিজিটাল সেবায় বিপ্লব: আড়াই মাসে অনলাইনে ২৫ হাজার ইউপি অনুমতি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের শুল্ক ও রাজস্ব প্রশাসনে অভূতপূর্ব ডিজিটাল রূপান্তর এনেছে। সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসে স্বয়ংক্রিয় অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ২৫ হাজার ব্যবহার অনুমতি (ইউপি) জারি করা হয়েছে। এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই চমকপ্রদ অগ্রগতির কথা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সফলতা
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এনবিআর "কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি" নামে একটি অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার চালু করেছে। এই উদ্ভাবনী ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো বন্ড সুবিধাভোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুততম সময়ে ও সর্বোচ্চ সুবিধার সাথে সেবা প্রদান করা। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে বন্ডেড গুদাম লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন অনলাইনে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে ব্যবহার অনুমতি সংগ্রহ করতে পারছে।
এনবিআর আরও উল্লেখ করেছে যে, আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র অনলাইনে যাচাইয়ের সুবিধার্থে এই সফটওয়্যারটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন ব্যবস্থার সাথে সম্পূর্ণভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। এই সংযোগের ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরাসরি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে গিয়ে সেবা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা সময় ও সম্পদের অপচয় রোধ করছে।
বাধ্যতামূলক অনলাইন সেবা ও পরিসংখ্যান
২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ব্যবহার অনুমতি জারিসহ এ-সংক্রান্ত সকল সেবা গ্রহণ ও প্রদানের ক্ষেত্রে এই সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বর্তমানে এনবিআরের অধীনস্থ তিনটি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকেই সম্পূর্ণ অনলাইন পদ্ধতিতে সকল ব্যবহার অনুমতি প্রদান করা হচ্ছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত সময়ের পরিসংখ্যান অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক:
- মোট অনলাইনে জারিকৃত ব্যবহার অনুমতির সংখ্যা: ২৪,৯৬৩টি
- এই সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার ইউপির কাছাকাছি, যা ডিজিটাল সেবার গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে
- শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সাড়া ইতিবাচক ও দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে
সমন্বিত প্রচেষ্টা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এই অনলাইন সেবাকে আরও সহজলভ্য ও কার্যকর করতে বর্তমানে বহুমুখী সমন্বয় কাজ চলছে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে:
- বন্ড সুবিধাভোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনলাইন ব্যবস্থার সাথে সংযোগ
- বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সাথে একীভূতকরণ
- শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তরের সাথে সমন্বয়
- বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর অনলাইন ব্যবস্থার সাথে সংযুক্তিকরণ
এনবিআরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অনলাইনে ব্যবহার অনুমতি জারি হওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এই সাশ্রয় শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ছে। দেশের রপ্তানি বাণিজ্য আরও গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন ঘটছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের দিকে অগ্রযাত্রা
কাস্টমস প্রশাসনকে সম্পূর্ণ আধুনিক, স্বচ্ছ ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে এনবিআর পর্যায়ক্রমিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো বন্ড নিরীক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট সকল সেবা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা। এই রূপান্তর শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; বরং এটি সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
এনবিআরের এই ডিজিটাল উদ্যোগ দেশের রাজস্ব প্রশাসনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে সহজতর করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছে। ভবিষ্যতে আরও অধিক সংখ্যক সেবা অনলাইনে চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাত আরও গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।



