ওয়াশ খাতে সরকারি বরাদ্দ কমছে, শহর-গ্রাম বৈষম্য উদ্বেগজনক
দেশে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে সরকারি বরাদ্দ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা ধীরে ধীরে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ২২৮ কোটি টাকাতে পৌঁছায়। তবে এর পর থেকেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ কমে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৯৮১ কোটি টাকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি আরও ২২ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমে ১১ হাজার ৬১৭ কোটি টাকায় নেমে আসে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ আরও কমে ১০ হাজার ৯০১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতের বরাদ্দ কমিয়ে ৯ হাজার ১৪১ কোটি টাকা করা হয়েছিল।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ওয়াশ খাতে যে বৈষম্য, তা ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। আবার বরাদ্দের ক্ষেত্রে একধরনের নীতি–ধারাবাহিকতার অভাব রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রভাব কাজ করেছে। বৈষম্যের বিষয়টি আসলে সঠিকভাবে অনুভব করা হয়নি। বিদ্যমান নীতিমালাগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। তাই বৈষম্যও কমছে না।
সংস্থাভিত্তিক বরাদ্দে বৈষম্য
ওয়াশ খাতে বিভিন্ন সংস্থার বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, চারটি বড় শহরের ওয়াসাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে ঢাকা ওয়াসা—প্রায় ৩ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। অন্যদিকে সারা দেশে ওয়াশ সেবা প্রদানকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) বরাদ্দ কমে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রামের পার্বত্য জেলাগুলোতেও তুলনামূলকভাবে কম প্রকল্প সহায়তা বরাদ্দ হয়েছে।
খাতভিত্তিক চিত্র: পানি ও স্যানিটেশনে কাটছাঁট
২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় দেখা যায়, পানি ও স্যানিটেশন—এই দুই প্রধান খাতে বরাদ্দ কমেছে। পানি খাতে বরাদ্দ কমে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে আবার ৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকা হলেও আগের তুলনায় কম প্রবণতা রয়েছে। স্যানিটেশন খাতে বরাদ্দ কমে ২ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা থেকে ২ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা হয়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সচেতনতা কার্যক্রম, পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্পে বরাদ্দ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
শহর-গ্রাম বৈষম্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
শহর-গ্রামে ওয়াশ খাতে বৈষম্য কমলেও উদ্বেগ রয়ে গেছে। দেশে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের মধ্যে বরাদ্দ বৈষম্য কিছুটা কমলেও তা এখনো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বাজেট বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শহরাঞ্চলে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ২৮৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে কমে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫৬২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বরাদ্দ কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ২৫৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অন্যদিকে গ্রামীণ অঞ্চলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল মাত্র ১ হাজার ৩২৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে বেড়ে ১ হাজার ৫৭৯ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও বেড়ে ২ হাজার ৬৪১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা হয়েছে।
দুর্গম অঞ্চলে আংশিক অগ্রগতি, চরাঞ্চল উপেক্ষিত
হাওর, উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকায় বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানো হলেও চরাঞ্চলের মতো দুর্গম এলাকাগুলো এখনো নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরে রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব অঞ্চলকে উপেক্ষা করলে বৈষম্যহীন উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সিটি করপোরেশন ও ওয়াসায় অসম বণ্টন
১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে মাত্র ৭টি ওয়াশ বরাদ্দ পেয়েছে। রাজশাহী, রংপুর, কুমিল্লা, সিলেটসহ কয়েকটি বড় শহর বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াসাগুলোর মধ্যে বরাদ্দ কমলেও ঢাকা ওয়াসা একাই বড় অংশ দখল করে রেখেছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও ঝুঁকির মুখে পড়বে।



