ঈদের পর নতুন সরকারের সামনে তিন বড় চ্যালেঞ্জ: জ্বালানি সংকট, অর্থনীতি ও রাজনীতি
বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠনের মাত্র এক মাস পরেই ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। কিন্তু এই উৎসবের পরই সরকারের সামনে অপেক্ষা করছে নানামুখী চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সরকারকে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি নিয়ে বিশ্বব্যাপী চিন্তা বাড়ছে। বাংলাদেশেও এই সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনায় জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলছেন, ‘ঈদের পর অফিস-আদালত ও শিল্প-কারখানা পূর্ণ শক্তিতে চালু হলে বিদ্যুতের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এপ্রিল-মে মাসে প্রচণ্ড গরমে এই চাহিদা আরও বাড়তে পারে।’ কৃষি উৎপাদনের জন্য সার ও সেচের জ্বালানি তেলের চাহিদাও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, ‘জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনই এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি জানান, সরকার জ্বালানির বিকল্প উৎস অনুসন্ধান, সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং স্পট মার্কেট থেকে সংগ্রহ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: দীর্ঘমেয়াদি সংকট
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের জন্য সবচেয়ে জটিল চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির সামষ্টিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, ‘জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সরাসরি অন্যান্য পণ্যের মূল্যকে প্রভাবিত করে। রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য এটি আরও চ্যালেঞ্জিং।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সামনের অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের সম্প্রসারণ, এবং ব্যয়-রাজস্ব সামঞ্জস্য করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
- কৃষি উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করা
- দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি
- নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতি কমানো
- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা
রাজনৈতিক চাপ: বিরোধী দলের দাবি ও আন্দোলন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদের পর সরকারকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনসহ নানা ইস্যুতে চাপের মুখোমুখি হতে হবে। রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, ‘স্থানীয় সরকারে দলীয়করণ জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিরোধী দল জুলাই সনদ ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখবে—এটা নিশ্চিত।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জুলাইয়ের মামলার বিচার নিয়েও সরকারের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, ‘রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যাবে, কিন্তু অর্থনীতির অচলাবস্থা কাটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’
সরকার দাবি করছে, তারা ইতোমধ্যেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে এবং ঈদের পর এর গতি আরও বাড়বে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই চ্যালেঞ্জগুলো আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।



