সিংগাইরে পশুর হাট ইজারায় শিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়েনি দরপত্র, কোটি টাকার রাজস্ব অনিশ্চয়তা
মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পশুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়ায় এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দরপত্রের শিডিউল বিক্রি হওয়া সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে একটি প্রস্তাবও জমা পড়েনি, যা সরকারের কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব আদায় নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই ঘটনা স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, এবং বিষয়টি তদন্তের দাবি উঠছে।
ইজারা প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩৩ সনের জন্য চান্দহর ইউনিয়নের সিরাজপুর পশুর হাট, বায়রা পশুর হাট, জয়মন্টপ পশুর হাট এবং জামির্তা ইউনিয়নের চর রাজনগর পশুর হাটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারের ইজারা দিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী শিডিউল বিক্রিও সম্পন্ন হয়েছিল, কিন্তু নির্ধারিত সময় ৫ মার্চ বেলা ১টা পর্যন্ত দরপত্র বাক্সে কোনো প্রস্তাব জমা পড়েনি। উপজেলার অভিজ্ঞ ইজারাদারদের মতে, সিংগাইরে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি বলে তাদের জানা নেই।
বিভিন্ন হাটের সরকারি মূল্য ও শিডিউল বিক্রির তথ্য
প্রশাসন সূত্রে আরও জানা যায়, চান্দহর ইউনিয়নের সিরাজপুর পশুর হাটের সরকারি নিম্নমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ৪৯ লাখ ৮৫ হাজার ৯১৪ টাকা, এবং শিডিউলের মূল্য ছিল ৩০ হাজার ৬০০ টাকা। চারজন শিডিউল সংগ্রহ করলেও কেউ জমা দেননি। বায়রা পশুর হাটের ক্ষেত্রে গত তিন বছরের গড়ের ভিত্তিতে প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয় ৭৭ লাখ ১১ হাজার টাকা, এবং ১৬ হাজার ২০০ টাকা মূল্যের ছয়টি শিডিউল বিক্রি হলেও কোনো প্রস্তাব জমা পড়েনি। প্রতিযোগিতাপূর্ণ হিসেবে পরিচিত জয়মন্টপ পশুর হাটের সরকারি সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪৬ লাখ ৩৮ হাজার ৬৬৬ টাকা, এবং শিডিউলের মূল্য ছিল ২৮ হাজার ৮০০ টাকা। ছয়জন শিডিউল কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউ দরপত্র দাখিল করেননি। জামির্তা ইউনিয়নের চর রাজনগর পশুর হাটের সরকারি নিম্নমূল্য ছিল ৩২ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬০ টাকা, এবং শিডিউলের মূল্য ৭ হাজার ২০০ টাকা। চারজন শিডিউল সংগ্রহ করলেও জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপ
সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুন নাহার জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব হাটের জন্য কোনো দরপত্র পাওয়া যায়নি, তবে শিডিউল ক্রয়কারীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। প্রথম ধাপে প্রস্তাব না পাওয়ায় ১১ মার্চ দ্বিতীয় দফায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, এবং নতুন সময়সূচি অনুযায়ী ১২ মার্চ বিকাল ৩টা পর্যন্ত প্রস্তাব জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারি বিধান অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফাতেও কেউ আগ্রহ না দেখালে ১ বৈশাখ ১৪৩৩ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত এসব হাট খাস বাজার হিসেবে পরিচালনা করে টোল আদায় করা হবে, কিন্তু এতে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
স্থানীয় সূত্র দাবি করছে, শিডিউল ক্রয়কারীদের অনেকেই বিএনপি ঘরানার স্থানীয় নেতা হিসেবে পরিচিত, এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাদের নাম প্রকাশ করলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হতে পারে— এমন যুক্তিতে প্রশাসন তালিকা প্রকাশ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে ব্যবসায়ী ও ইজারাদারদের একাংশের প্রশ্ন, একাধিক বড় পশুর হাটে একযোগে শিডিউল বিক্রি হলেও দরপত্র না পড়ার ঘটনা স্বাভাবিক নয়, এবং এর পেছনে কোনো অঘোষিত সমঝোতা বা প্রভাব রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সতর্কতা
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুন নাহার আরও জানান, তিন বছরের গড় মূল্যের ভিত্তিতে এবার সরকারি মূল্য ৬ শতাংশ কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে, তবুও কেন শিডিউল সংগ্রহের পরও কেউ প্রস্তাব জমা দেয়নি, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, শিডিউল ক্রয়কারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতে হাট ইজারা নিয়ে অনেকে লোকসানের মুখে পড়েছিলেন, এবং সেই অভিজ্ঞতার কারণে প্রথম দফায় প্রস্তাব জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। তবে এখনো সময় আছে, শেষ মুহূর্তে কেউ দরপত্র জমা দিতে পারেন, তা না হলে সরকারিভাবে খাস আদায়ের ব্যবস্থা করা হবে। সব মিলিয়ে, সিংগাইরের কয়েকটি বড় হাটে শিডিউল বিক্রি হলেও প্রস্তাব জমা না পড়ার এই পরিস্থিতি স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক মহল ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, এবং বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্তের দাবি জানানো হচ্ছে।
