উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির মধ্যেই আসন্ন জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, সিপিডির বিশ্লেষণে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ
মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির মধ্যেই আসন্ন বাজেট, সিপিডির বিশ্লেষণ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির মধ্যেই আসন্ন জাতীয় বাজেট প্রণয়ন

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আগামী জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে সরকারকে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদী সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার—এ দুই লক্ষ্য সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

সিপিডির বিশ্লেষণে অর্থনীতির মিশ্র চিত্র

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব বিষয় তুলে ধরেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। আসন্ন জাতীয় বাজেট উপলক্ষে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং নীতিগত করণীয় নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক উপস্থাপনা করেন তিনি।

উপস্থাপনায় বলা হয়, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের প্রবণতাই রয়েছে। তবে, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির শঙ্কা

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ, পুরো অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ দশমিক পাঁচ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বাকি সময়ের মধ্যে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৫৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

রাজস্ব আদায়ের ধীরগতির কারণে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘাটতি সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

উন্নয়ন ব্যয়ে ধীরগতি ও ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা

চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০ দশমিক তিন শতাংশ, যা গত প্রায় দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। সিপিডির মতে, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প পর্যালোচনার কারণে এ ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।

রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যেতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

মূল্যস্ফীতির চাপ ও বৈদেশিক খাতের মিশ্র চিত্র

দেশে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনও তা স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।

বৈদেশিক খাতেও মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রফতানি আয় কিছুটা কমেছে। তবে, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বেড়েছে। এর ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এ সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বড় চ্যালেঞ্জ

দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী। বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগও (এফডিআই) খুব বেশি বাড়েনি। সিপিডির মতে, বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা কঠিন হয়ে পড়বে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করায় কর্মসংস্থানের চাপও বাড়ছে।

এলডিসি উত্তরণ সামনে ও বাস্তবসম্মত বাজেটের পরামর্শ

২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কিছু সুবিধা কমে যেতে পারে। তাই এখন থেকেই রফতানি বহুমুখীকরণ, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শুল্ক কাঠামো সংস্কারের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী বাজেটে রাজস্ব, ব্যয় এবং প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, সঠিক নীতি গ্রহণ করা গেলে আসন্ন বাজেট দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।