সংবাদমাধ্যমে যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা প্রকাশ, জরিপে ১৫% সংবাদকর্মী ভুক্তভোগী
সংবাদমাধ্যমে যৌন হয়রানি নীতিমালা প্রকাশ, জরিপে ১৫% ভুক্তভোগী

সংবাদমাধ্যমে যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা প্রকাশ, জরিপে ১৫% সংবাদকর্মী ভুক্তভোগী

আজ রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদমাধ্যমের জন্য যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা প্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তারা সংবাদকর্মীদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের ‘স্ট্রেনথেনিং উইমেন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্ক টু ট্যাকল সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় এই নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যেখানে দেখা গেছে বাংলাদেশি সংবাদকর্মীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

জরিপের ফলাফল: ১৫ শতাংশ সংবাদকর্মী যৌন হয়রানির শিকার

ওয়ান-ইফরা উইমেন ইন নিউজ, ‘সিটি সেন্ট জর্জেস, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’ ও বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন ২০২৫ সালে একটি জরিপ পরিচালনা করে। এই জরিপে অংশ নেওয়া ৩৩৯ বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ সংবাদকর্মীর মধ্যে ১৫ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে তথ্য উঠে এসেছে। ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। জরিপটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিচালিত হয়।

জরিপ অনুসারে, ৬০ শতাংশ নারী ও ৯ শতাংশ পুরুষ মৌখিকভাবে যৌন হয়রানি, ৪৮ শতাংশ নারী ও ১৫ শতাংশ পুরুষ অনলাইনে যৌন হয়রানি আর ২৪ শতাংশ নারী ও ৭ শতাংশ পুরুষ শারীরিকভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে অংশ নেওয়া সংবাদকর্মীদের মধ্যে সাংবাদিক, ফটোসাংবাদিক, কারিগরি ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তি ছিলেন ২৪২ জন। সম্পাদক, প্রযোজক, ব্যবস্থাপক, বিভাগীয় প্রধান, টিম লিড পর্যায়ের সংবাদকর্মী ছিলেন ৮৬ জন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বক্তাদের মতামত: নীতিমালা বাস্তবায়ন ও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা গ্রহণ ও তা চর্চা করা উচিত। ভুক্তভোগীদের নীরব না থেকে প্রতিকার চেয়ে সোচ্চার হওয়া উচিত। নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের চুপ না থেকে ঘটনার প্রতিকার চাইতে সোচ্চার হতে হবে। যৌন হয়রানির প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনকে যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা নিয়ে সম্পাদক পরিষদ, নোয়াবসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে বৈঠক করার আহ্বান জানান।

প্রথম আলো ইংরেজি ওয়েবের হেড অব কনটেন্ট আয়েশা কবির বলেন, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা সম্পর্কে জানতে হবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে তা অনুসরণের চর্চা করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করার বিষয়টিকে নীতিমালায় যুক্ত করার পরামর্শ দেন।

নীতিমালার মূল বিষয়গুলো

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা অনুসারে তৈরি এই নীতিমালায় বলা হয়েছে:

  • অভিযোগ পাওয়ার পর বিলম্ব, উপেক্ষা বা অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা যাবে না।
  • অভিযোগ পাওয়ার পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় প্রাথমিক মূল্যায়ন ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
  • তদন্তের সময়সীমা সর্বনিম্ন ৭ থেকে সর্বোচ্চ ৬০ কার্যদিবস হবে।
  • ৫ সদস্যের কমিটি করতে হবে, কমিটির প্রধান হবেন নারী ও কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের বাইরের অন্তত দুজন সদস্য রাখতে হবে।
  • অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ইচ্ছাকৃত মিথ্যা অভিযোগ বলে প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

ধর্ষণের অভিযোগ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

ধর্ষণের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের সংবাদমাধ্যম উন্নয়ন ব্যবস্থাপক রাশেদুল হাসান বলেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী ৯ জন (৭ জন নারী ও ২ জন পুরুষ) ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন আরও বিশদভাবে জানতে চেয়েছে ওয়ান-ইফরার কাছে। জবাব আসার পর জানা যাবে, ধর্ষণের ঘটনা সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সহকর্মীদের মাধ্যমে ঘটেছে, নাকি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে ঘটেছে।

বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন বলেন, ‘দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও নারী সাংবাদিক ৮-১০ শতাংশের বেশি নয়। সংবাদমাধ্যমে নারী সহায়ক পরিবেশ তৈরি না হলে নারী সংবাদকর্মী বাড়বে না।’ নারী সহায়ক কর্মপরিবেশ তৈরির জন্য বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা তৈরি করেছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ

অনুষ্ঠানে উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (ডব্লিউজেএনবি) সমন্বয়কারী আঙ্গুর নাহার মন্টি সঞ্চালনা করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকেরা অন্যদের বৈষম্য-নিপীড়ন নিয়ে লেখেন, তাই নিজেদের সঙ্গে ঘটা নিপীড়ন চেপে রাখার দায় সংবাদকর্মীদের নেওয়া উচিত নয়। নীতিমালাটি উপস্থাপন করেন বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের আরাফাত সিদ্দিক। অনলাইনে যুক্ত হয়ে নীতিমালা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সুলাইমান নিলয়।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিদেশি সংবাদমাধ্যম প্রতিনিধিদের সংগঠন ওকাবের সভাপতি নজরুল ইসলাম, চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বিশেষ প্রতিনিধি মুনিমা সুলতানা, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নাসিমা আক্তার সোমা, ইন্টারনিউজের কান্ট্রি প্রতিনিধি শামীম আরা শিউলী, ডেইলি অবজারভারের বিশেষ প্রতিনিধি শাহনাজ বেগম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নাদিরা কিরণ, বৈশাখী টেলিভিশনের হেড অব নিউজ জিয়াউল কবীর সুমন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ইনস্টিটিউট অব সাইকোলজি অ্যান্ড হেলথের পরিচালক নাজমুল হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মিনহাজ উদ্দিন, ডিজিটালি রাইটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক তানভীর সোহেলসহ অনেকে।