সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২ শতাংশ: গোলটেবিলে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের আহ্বান
সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ২ শতাংশ: গোলটেবিলে আলোচনা

সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২ শতাংশ: গোলটেবিল বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জোরালো দাবি

জাতীয় সংসদের সরাসরি ৩০০ আসনে এবার মাত্র ৭টি আসনে নারী রয়েছেন, যা মোট প্রতিনিধিত্বের ২ শতাংশের সামান্য বেশি। এই হতাশাজনক পরিস্থিতি পরিবর্তনে রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতা পরিবর্তন এবং নারীর বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতা রোধে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। গতকাল শনিবার ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) ও প্রথম আলো আয়োজিত ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ও ডিজিটাল নিরাপত্তা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা এই মত প্রকাশ করেন।

সংরক্ষিত আসনে যোগ্য নারীদের সুযোগ দাবি

বক্তারা উল্লেখ করেন, শিগগিরই সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন শুরু হবে। এই আসনে যোগ্য ও তৃণমূল থেকে উঠে আসা নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হলে সংসদে নারীর শক্তিশালী ভূমিকা নিশ্চিত হতে পারে। বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল বলেন, ‘নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশে বিএনপি সব সময় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। নারীকে নারী হিসেবে না দেখে নাগরিক হিসেবে দেখলে তাদের আবেদনকে অনুকম্পা বা করুণার মতো মনে করা হবে না।’ তিনি আরও যোগ করেন, বিএনপি সংরক্ষিত আসনে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যোগ্য নারী কর্মীদের মনোনয়ন দেবে।

অনলাইন সহিংসতা: নারী রাজনীতিবিদদের জন্য বড় হুমকি

অনুষ্ঠানে আলোচকরা অনলাইনে নারী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ভ্রান্ত ও অপতথ্য ছড়ানো এবং সহিংসতাকে একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, ‘অনলাইনে সহিংসতা রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি কমিয়ে দেয়। সংঘবদ্ধ আক্রমণ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নারী রাজনীতিবিদের সংখ্যা কমিয়ে আনতে অনলাইন সহিংসতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।’ পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক শামীমা পারভীন সিআইডির সাইবার ইউনিটের তথ্য তুলে ধরে বলেন, সাইবার হয়রানির ১ লাখ ৭০ হাজার অভিযোগের মধ্যে ৬০ শতাংশ নারীর, কিন্তু মাত্র ৪০টি অভিযোগে রায় পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নারী সংগঠন ‘নারীশক্তি’র আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্পণ্য অনেক। দলগুলোকে এ দীনতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, স্থানীয় সরকার পর্যায়কে শক্তিশালী করতে হবে এবং বিদ্যমান কাঠামো পাল্টাতে হবে। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথরিন সিসিল বলেন, জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের পর থেকে অনলাইন হয়রানির কারণে জনজীবনে যুক্ত হতে আগ্রহী নারীর সংখ্যা কমে গেছে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নারীর ভূমিকা

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ পরিচালক লিপিকা বিশ্বাসের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধু সমতার প্রশ্ন নয়, এটি উন্নয়ন ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের সুশাসনের শর্ত। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, নারীদের সমান সুযোগ দিলে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ইউএনডিপির তথ্য মতে, সংসদে ৩০ শতাংশ নারী থাকলে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোর উপর জোর দেন:

  • রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটি স্তরে ৩৩ শতাংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
  • অনলাইন সহিংসতা রোধে দলগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টা গড়ে তোলা।
  • সংরক্ষিত আসনে যোগ্য ও তৃণমূল নারীদের মনোনয়ন দেওয়া।
  • পুলিশের সাইবার ইউনিটে জনবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

অনুষ্ঠানটি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী সঞ্চালনা করেন। এই আলোচনা বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।