নারী অধিকার ও ন্যায্যতার লড়াই: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ
নারী অধিকার লড়াই: ঢাবি শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

নারী অধিকার ও ন্যায্যতার লড়াই: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য 'অধিকার, ন্যায্যতা ও পদক্ষেপ: সব নারী ও মেয়েদের জন্য' নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সহিংসতা, নিপীড়ন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী নারীদের সম-অধিকার ও ন্যায্যতার দাবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: নারীদের বৈষম্য ও চ্যালেঞ্জ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীদের আইনি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এখনও প্রকট। বৈশ্বিকভাবে, আইনগত সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের তুলনায় মাত্র ৬৪ শতাংশ ভোগ করেন। ক্ষতিকর সামাজিক বিধিবিধান থেকে শুরু করে বৈষম্যমূলক আইন, নারীরা ন্যায্যতার সব ক্ষেত্রেই সুপ্রোথিত অন্তরায়ের সম্মুখীন হন।

  • বিশ্বের ১৮টি দেশে স্বামীর অনুমতি ছাড়া নারীরা কাজ করতে পারেন না।
  • ৩২টি দেশে নারীদের পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়া পুরুষদের থেকে ভিন্নতর।
  • বৈশ্বিকভাবে মোট কৃষিজমির মাত্র ১০ শতাংশের মালিক নারীরা, যদিও কৃষি খাতে বেশির ভাগ কাজ তারা করেন।
  • প্রতি বছর ১ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি বালিকাকে বাল্যবিবাহের শিকার হতে হয়, যা প্রতি ২ সেকেন্ডে একজন বালিকাবধূ তৈরি করে।

বর্তমান অগ্রগতির হার বজায় থাকলে, নারী-পুরুষের মধ্যকার আইনগত বৈষম্য দূর করতে বিশ্বের ২৮৬ বছর লাগবে। পূর্ব এশিয়ায় অর্থনৈতিক অসমতা দূর করতে ১১১ বছর এবং মধ্যপ্রাচ্যে ৩৫৬ বছর প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: নথি ও বাস্তবতার পার্থক্য

বাংলাদেশে নারীর ন্যায্যতা ও সম-অধিকারের বিষয়টি সংবিধান, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং জাতীয় নীতিমালায় সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত। ২০১১ সালের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা, ২০১৩-২০১৫ সালের জাতীয় কার্য পরিকল্পনা এবং ২০১৮-২০২২ সালের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তার জাতীয় কার্যপরিকল্পনা নারী অধিকারের প্রতি অঙ্গীকার প্রকাশ করে।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশের নারীরা অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চারটি মাত্রায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

  1. অর্থনৈতিক বৈষম্য: প্রতি ৩ জন নারীর মাত্র ১ জনের ব্যাংকে লেনদেন আছে। কর্মক্ষম নারীদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ শ্রমবাজারে আছেন, যেখানে পুরুষের হার ৮১ শতাংশ। উচ্চ ব্যবস্থাপনা পদে নারীর অবস্থান মাত্র ১২ শতাংশ, এবং নারীর গড় আয় পুরুষের চেয়ে ১০ শতাংশ কম।
  2. সামাজিক বৈষম্য: বাংলাদেশে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের দুই-তৃতীয়াংশের বাল্যবিবাহ হয়। ৭৭ শতাংশ নারী গর্ভধারণ সম্পর্কে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, এবং ৭৩ শতাংশ নারী গৃহাভ্যন্তরে সহিংসতার শিকার হন।
  3. রাজনৈতিক বৈষম্য: গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ১০টি দল নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছিল। সংরক্ষিত আসন বাদ দিলে, জাতীয় সংসদে মাত্র ৭ জন মহিলা সাংসদ রয়েছেন।
  4. সাংস্কৃতিক বৈষম্য: শিল্প-সাহিত্যাঙ্গন ও খেলার জগতে নারীরা যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

সমাধানের পথ: প্রচারণা, প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশে নারীর ন্যায্যতা ও অধিকারের সমতা নিশ্চিত করতে তিনটি মাত্রিক পদক্ষেপ প্রয়োজন:

  • প্রচারণা: সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য প্রচারমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সামাজিক আন্দোলনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
  • প্রয়োগ: বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক নীতিমালায় নারী-বান্ধব নীতি গ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর সম-অংশগ্রহণ বাড়ানো দরকার।
  • প্রতিষ্ঠান: রাষ্ট্রযন্ত্র, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ে একটি সুষ্ঠু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নারী-বান্ধব ও সংবেদনশীল হতে হবে।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য শুধু তাত্ত্বিক নয়, বাস্তবোচিত পদক্ষেপের দাবি রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ এই দাবিকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব সমাজে নারীর যথার্থ অবস্থান নিশ্চিত করতে জোরালো ও সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।