নারীর অধিকার নিশ্চিতকরণ: আইন ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিশাল ফারাক
নারীর অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব—যা প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে অপরিহার্য। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ, সমাজ ও পরিবারে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং আইনের শাসন বাস্তবায়ন রাষ্ট্রের মূল কর্তব্য হলেও, বাস্তব পরিস্থিতিতে নারীর অধিকার এখনো বহু ক্ষেত্রে উপেক্ষিত বলে মনে করছেন বিশিষ্ট নারীনেত্রীরা।
আইনের প্রয়োগহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতা: প্রধান চ্যালেঞ্জ
তাদের মতে, নারীর অধিকার, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে নারীর সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবের কারণে নারীরা এখনো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নারীনেত্রীরা উল্লেখ করেন, নারীর অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন ও নানা উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি বিদ্যমান। বহু আইন ও নীতি প্রণয়ন করা সত্ত্বেও, সেগুলোর বেশিরভাগই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, বাস্তবে প্রয়োগ খুবই সীমিত। ফলস্বরূপ, নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৬: প্রতিপাদ্য ও বাণী
এই প্রেক্ষাপটে, আজ ৮ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৬। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি বিশেষ বাণী প্রদান করেছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতা। বর্তমানে নারীর চলাচল, পোশাক বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য ও সামাজিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা একটি ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। একটি শিশু বা তরুণীর সুস্থ বিকাশের জন্য নিরাপদ পরিবেশ অত্যাবশ্যক হলেও, সেই পরিবেশ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। তিনি সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, সরাসরি ও সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ও রাজনৈতিক সংগ্রাম
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনৈতিক দল ও পরিবার—সব জায়গায় এখনো গভীর পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব বিরাজ করছে। ফলে একজন নারীকে জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়। রাজনৈতিক পরিবার থেকে না আসা একজন নারীর জন্য রাজনীতিতে টিকে থাকা আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, একটি মেয়ে যদি নিজের পরিবারেই বৈষম্যের শিকার না হয়, তাহলে সে আত্মবিশ্বাস নিয়ে সমাজে দাঁড়াতে পারে। নারীপক্ষের সদস্য শিরিন পারভীন হক বলেন, নারীর অধিকারের ক্ষেত্রে সরকারের অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত নারী কমিশনে প্রায় চারশো সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। এর বড় একটি অংশ বাস্তবায়িত হলে নারীর অগ্রযাত্রা অনেকটাই এগোবে। তিনি বলেন, ‘অধিকার’ শুধু আইনি বিষয় নয়; এটি নাগরিক হিসেবে নিজের প্রাপ্যতা ও মর্যাদার প্রশ্নও বটে।
প্রধানমন্ত্রীর বাণী: টেকসই উন্নয়নে নারীর ভূমিকা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেছেন—‘একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নারীর অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। বিশ্বে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। নারীদের রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনীতির মূলধারার বাইরে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশেষ করে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে ঘরে-বাইরে সামগ্রিক উন্নয়নের সুফল সম্ভব নয়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। নারীদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মাদার অব ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়া যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিলেন।’
