আন্তর্জাতিক নারী দিবসে উদ্বেগ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে অপতথ্যের বিস্তার
নারী দিবসে উদ্বেগ: সোশ্যাল মিডিয়ায় অপতথ্যের লক্ষ্য নারীরা

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের লক্ষ্য নারীরা

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে রিউমর স্ক্যানার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে অপতথ্যের বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে তুলে ধরেছে। তথ্য যাচাইকারী এই প্রতিষ্ঠানটি গত তিন মাসে (ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোট ২,০২৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যে ৪৭২টি অপতথ্য সরাসরি নারীদের কেন্দ্র করে ছড়ানো হয়েছে, যা মোট শনাক্ত হওয়া অপতথ্যের প্রায় ২৩ শতাংশের সমান।

নারীদের নেতিবাচক উপস্থাপন ও ডিজিটাল হুমকি

রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব অপতথ্যের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। কখনো তাদের বক্তব্য বিকৃত করা হচ্ছে, আবার কখনো পুরোনো বা ভিন্ন প্রসঙ্গের ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে নতুন গল্প তৈরি করা হচ্ছে। এই অপতথ্যের প্রবণতা শুধু নারীর ব্যক্তিগত সুনাম ক্ষুণ্নই করছে না, বরং জনপরিসরে নারীদের উপস্থিতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আগামীকাল রোববার আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হবে, সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে। রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আসন্ন ৮ মার্চের প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ, এটি স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে ডিজিটাল যুগে নারীদের স্বীকৃতি, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সচেতনতা ও দায়িত্বশীল তথ্যচর্চা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতির মাঠে নারীদের বিরুদ্ধে অপতথ্যের প্রবণতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সব সময়ই চ্যালেঞ্জিং হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের বিস্তার এই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানের উদাহরণ দিয়ে রিউমর স্ক্যানার দেখিয়েছে, তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যোগ না দিলেও তাঁর বাবার সঙ্গে গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পর থেকে সামাজিক-রাজনৈতিক-কূটনৈতিক নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তাঁকে নিয়ে অপতথ্য তাই দ্রুত গতিতে বিস্তার লাভ করেছে, যেখানে ডিসেম্বরের আগে মাত্র পাঁচটি অপতথ্যে তাঁর নাম ছিল, সেখানে গত তিন মাসে তাঁকে জড়িয়ে ৪১টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এসব অপতথ্যের প্রায় ৫৪ শতাংশেই তাঁকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।

এছাড়াও, গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর আগে তাঁকে নিয়ে ছড়ানো অপতথ্যও বিশ্লেষণ করেছে রিউমর স্ক্যানার। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে খালেদা জিয়াকে ঘিরে মোট ৫৭টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, তবে এর মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ পোস্টে তাঁকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশছাড়া আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে নিয়ে গত তিন মাসে ১২৪টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ পোস্টে তাঁকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা দেখা গেছে। সব মিলিয়ে গত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ২৬ জন নারী রাজনীতিবিদকে ঘিরে ৩৩০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

নির্বাচনী মৌসুমে নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার

রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদন অনুসারে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে অন্তত তিন জন নারী প্রার্থীকে ঘিরে ২৬টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ে নারী প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক যোগ্যতা ও সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে নানা গুজব ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারাকে নিয়ে ১৩টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানাকে নিয়ে ৮টি এবং ফরিদপুর-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদকে নিয়ে ৩টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী মাহমুদা মিতুকে নিয়ে আটটি এবং সাগুফতা বুশরা মিশমাকে নিয়ে একটি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

বিনোদন জগতের নারী তারকারাও অপতথ্যের শিকার

বিনোদনজগতের নারীরাও কীভাবে অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন, তা রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, গত তিন মাসে অন্তত ১৫ জন নারী তারকাকে ঘিরে ১৮টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে অভিনেত্রী পরীমনিকে নিয়ে চারটি অপতথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া তমা মির্জা, তানিয়া বৃষ্টি, মেহজাবীন চৌধুরী, সাদিয়া আয়মান, শবনম ফারিয়া, অপু বিশ্বাস, মাহিয়া মাহি, আজমেরী হক বাঁধন, অর্চিতা স্পর্শিয়া, সাবিলা নূর, পূর্ণিমা, সিমরিন লুবাবা, সুবর্ণা মুস্তাফা ও মেহের আফরোজ শাওন—প্রত্যেকে একটি করে অপতথ্যের শিকার হয়েছেন।

সাম্প্রদায়িক অপতথ্যেও নারীরা লক্ষ্যবস্তু

রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত তিন মাসে ৪৭টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি, অর্থাৎ প্রায় ৩৬ শতাংশ নারীদের ঘিরে ছড়ানো হয়েছে। এসব অপতথ্যের প্রায় ৮২ শতাংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচার করা হয়েছে বলে রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে।

ভুয়া ফটোকার্ড ও অশ্লীল কনটেন্টের মাধ্যমে নারীদের লক্ষ্যবস্তু করা

সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকেও গত তিন মাসে একাধিক অপতথ্যের মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁর দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিষয় যুক্ত করে বিভ্রান্তিকর দাবি প্রচার করা হয়েছে। এই সময়ে তাঁকে ঘিরে অন্তত ১১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

নারীদের ছবি বা ভিডিও সম্পাদনা করে তা অশ্লীল কনটেন্ট হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, গত তিন মাসে এমন অপতথ্যের শিকার হয়েছেন জাইমা রহমান, মাহমুদা মিতু, জান্নাত আরা রুমি ও তাসনিম জারা।

ডাকসু সদস্য ও ইনকিলাব মঞ্চের নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা তিন মাসে ২৬টি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন। এর প্রায় ৩৮ শতাংশই গণমাধ্যমের নাম ও লোগো ব্যবহার করে তৈরি নকল ফটোকার্ডের মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে বলে রিউমর স্ক্যানার জানায়।