ব্রিটিশ কাউন্সিলের ১৩টি অনুদানে নারী সমতা ও শিল্পকলার উদ্যোগ
নারী সমতা ও সামাজিক পরিবর্তনে শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরতে উইমেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড (ওয়াও) বাংলাদেশ ২০২৫–২৬–এর আওতায় ১৩টি অনুদান প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটিশ কাউন্সিল। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের আঞ্চলিক পর্যায়ে তিনটি ওয়াও চ্যাপ্টারের প্রকল্প এবং ১০টি শিল্পীদের দ্বারা পরিচালিত প্রকল্পে সহায়তা প্রদান করা হবে। প্রকল্পগুলো মূলত লিঙ্গ সমতা, জলবায়ু ন্যায়বিচার, প্রযুক্তি, ঐতিহ্যসহ অন্যান্য সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করবে, যা বাংলাদেশের সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করবে।
ওয়াও উদ্যোগের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশে যাত্রা
বৈশ্বিক ধারা হিসেবে বিশ্বজুড়ে শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে লৈঙ্গিক সমতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে ‘উইমেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ (ওয়াও)। ২০১০ সালে জুড কেলির হাত ধরে যুক্তরাজ্যে এই উৎসবের সূচনা হয় এবং ২০১৬ সাল থেকে ব্রিটিশ কাউন্সিল ‘ওয়াও ফাউন্ডেশন’–এর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে যাত্রা শুরুর পর ২০১৯ সালে ঢাকায় আয়োজন করা হয় ‘ওয়াও’ জাতীয় উৎসব, যা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রকল্প বাছাই প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্য
উইমেন অব দ্য ওয়ার্ল্ডের ২০২৫–২৬ পর্যায়ের জন্য বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যে অবস্থিত শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাবনার জন্য দুটি ‘ওপেন কল’ আহ্বান জানানো হয়েছিল। প্রতিযোগিতামূলক বাছাই প্রক্রিয়ার পর ১৩টি উদ্ভাবনী প্রকল্পকে এই অনুদান প্রদান করা হয়, যা বছরজুড়ে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পগুলোর মূল লক্ষ্য হলো সমকালীন সমাজ ও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে লিঙ্গ–সংশ্লিষ্ট আলোচনাকে অর্থবহভাবে উপস্থাপন করা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রতিক্রিয়া ও অনুদান বিজয়ীদের ভূমিকা
প্রকল্পটি নিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর স্টিফেন ফোর্বস বলেন, ‘এই বছরের সব “ওয়াও” গ্র্যান্ট বিজয়ীদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। শিল্প, সংস্কৃতি ও কমিউনিটিভিত্তিক উদ্ভাবন কীভাবে লৈঙ্গিক সমতা, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে, তা তাঁরা মেধা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁরা প্রচলিত ধারাকে চ্যালেঞ্জ করছেন, প্রতিনিধিহীন মানুষদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরছেন এবং বাংলাদেশের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাপূর্ণ ভবিষ্যতের পথ সুগম করে তুলতে ভূমিকা রেখেছেন।’
অনুদানপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত বিবরণ
এবারের ওয়াও বাংলাদেশের অনুদান বিজয়ীরা তাঁদের প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে নারীবাদী অভিব্যক্তির নতুন রূপরেখা তৈরি করছেন। অনুদান পাওয়া ওয়াও বাংলাদেশ চ্যাপ্টার প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে:
- ‘সাধনা’ ও ‘নৃত্যশিল্পী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ – যারা নারীবাদী সাহিত্যকে নাটকের মঞ্চে তুলে ধরবে।
- ‘কোটেক’–এর ইকোফেমিনিস্ট উদ্যোগ – নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে জলবায়ু সহনশীলতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগ নিয়ে কাজ করবে।
- ‘গ্রীন মিলিউ’ – বান্দরবানের তরুণদের নিয়ে সৃজনশীল নৃতাত্ত্বিক উৎসব পরিচালনা করছে।
‘ওয়াও বাংলাদেশ কমিশনস’ বিভাগে ‘সোয়িং সিডস’ প্রকল্পের মাধ্যমে জলবায়ুর সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ের সমাধান নিয়ে কাজ করবেন অ্যালেশা চৌধুরী। এ ছাড়া পরীক্ষামূলক নাটক ও মাল্টিমিডিয়া আর্ট ইনস্টলেশনের মাধ্যমে লিঙ্গ, সমাজ ও আত্মপরিচয়ের বিভিন্ন দিক তুলে ধরবে ‘স্পর্ধা ইন্ডিপেন্ডেন্ট থিয়েটার কালেকটিভ’, ‘হারস্টোরি ফাউন্ডেশন’ ও পলাশ ভট্টাচার্য্য ও সায়কা শবনম চৌধুরী। জেনিফার রিড তাঁর ‘দ্য উইমেন’স বায়োস্কোপ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপকে বাস্তুচ্যুত নারীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবে নতুনভাবে উপস্থাপন করবেন। পাশাপাশি ‘নিনাদ’ তুলে ধরবে কীভাবে হয়রানি ও নীরবতা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে প্রভাবিত করে। তারা নারী সাক্ষ্য ও পুরুষের বিশ্লেষণধর্মী ভাবনার মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা নিয়ে ঘাটতিগুলো সবার সামনে তুলে ধরবেন।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞানে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে আট মাসব্যাপী একটি কর্মসূচি পরিচালনা করবে সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ, যেখানে থাকবে নারীদের নেতৃত্বে নিরাপদ ‘মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ক্যাম্প।’ এ ছাড়া সবার জন্য সমান সুযোগসম্পন্ন নগর–পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবেন সায়কা ইকবাল মেঘনা ও শুভ্র শোভন চৌধুরী। নিজ কিউরেটোরিয়াল প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যবস্থায় বদলে যাওয়া আত্মপরিচয়ের রূপগুলো পরীক্ষা করবেন শার্মিলি রহমান। একসঙ্গে এই কাজগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নারীবাদী সৃজনশীলতার প্রয়োজনীয়তা ও সমাজ পরিবর্তনের এক অপার সম্ভাবনাকে তুলে ধরবে, যা দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
