ঝিনাইদহে গৃহবধূকে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন: স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে মামলা
ঝিনাইদহে গৃহবধূ নির্যাতন: স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে মামলা

ঝিনাইদহে যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে নির্মম নির্যাতন

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ভূপতিপুর গ্রামে যৌতুকের দাবিতে এক গৃহবধূকে নির্যাতন করে মাথার চুল কেটে দেওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার এই ঘটনায় গৃহবধূর বাবা মাজেদুল মণ্ডল বাদী হয়ে ঝিনাইদহ সদর থানায় মামলা করেছেন। নির্যাতনের শিকার চান্দিনা খাতুন (২২) বর্তমানে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মামলার বিবরণ ও ঘটনার পটভূমি

মামলার এজাহার অনুযায়ী, বুধবার রাতে চান্দিনা খাতুনকে তাঁর স্বামী আমিরুল চৌধুরী ও শ্বশুর-শাশুড়ি যৌতুকের দাবিতে নির্মমভাবে নির্যাতন করেন। তাঁরা চান্দিনার মাথার চুল কেটে দেন এবং একটি ঘরে আটকে রাখেন। পরদিন প্রতিবেশীদের মাধ্যমে খবর পেয়ে পরিবার তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চান্দিনার স্বামী আমিরুল চৌধুরী মালয়েশিয়ায় ছিলেন এবং এক মাস আগে দেশে ফিরেছেন। এই দম্পতির দুই ও তিন বছরের দুটি ছেলে রয়েছে।

পরিবারের বক্তব্য ও অভিযোগ

চান্দিনার বাবা মাজেদুল মণ্ডল বলেন, 'জামাই বিদেশ যাওয়ার আগে আমরা ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। এবার ফিরে এসে আবার ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দাবি করছে। আমরা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমার মেয়ের ওপর নির্যাতন শুরু করে। গত বুধবার রাতে আমার মেয়েকে মাথার চুল কেটে নির্যাতন করে আটকে রাখে। খবর পেয়ে আমরা গিয়ে উদ্ধার করে নিয়ে আসি।' চান্দিনার চাচা সাজেদুল ইসলামও এই অভিযোগ সমর্থন করে বলেন, 'জামাই বিদেশ থেকে ফিরে আবার অন্য দেশে যাওয়ার জন্য টাকা দাবি করছে। সেই টাকা আমার ভাই দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভাতিজিকে এমন নির্যাতন করেছে।'

অভিযুক্ত পক্ষের প্রতিক্রিয়া

অভিযুক্ত স্বামী আমিরুল চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর বাবা মিন্টু চৌধুরী মুঠোফোনে বলেন, 'ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমি বাড়িতে গিয়ে দেখি আমার ছেলে আমার বউমার মাথার চুল কেটে দিয়েছে। পরে আমাদের বাড়ির সঙ্গেই একটি দোকানে বউমাকে রাখা হয়। সেখানে খাট বিছানাসহ শোবার ব্যবস্থা আছে।' তিনি আরও দাবি করেন, 'আমার বউমা অন্য মানুষের সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত। ছেলে সেটা জানতে পেরে এমন করেছে।' তবে চান্দিনার পরিবার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

পুলিশের পদক্ষেপ ও আইনি ব্যবস্থা

ঝিনাইদহ সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহিরুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, গৃহবধূকে নির্যাতনের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি বলেন, 'এই ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' স্থানীয় সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে।

সমাজে নারী নির্যাতনের প্রেক্ষাপট

এই ঘটনা বাংলাদেশে নারী নির্যাতন ও যৌতুক প্রথার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, 'যৌতুকের দাবিতে নারী নির্যাতন একটি সামাজিক ব্যাধি, যা আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে।' সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সমাজে এই সমস্যার গভীরতা নির্দেশ করে।

চান্দিনা খাতুনের ঘটনা স্থানীয়ভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং নারী অধিকার রক্ষায় আরও জোরালো পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত তদন্ত শেষে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকরী ব্যবস্থা গৃহীত হবে।