তাহমিনা সালেহ: ভাষা আন্দোলনের প্রথম ১০ নারী ও এক অনন্য জীবনকথা
তাহমিনা সালেহ: ভাষা আন্দোলনের প্রথম ১০ নারী

ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির নারী তাহমিনা সালেহর অকথিত গল্প

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১০ জনের একটি মেয়ে-দল রাজপথের দিকে এগিয়ে চলেছে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—১৪৪ ধারা ভাঙবেই। ছেলেদের প্রথম দলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার পর এবার মেয়েদের পালা। তাহমিনা সালেহ স্মৃতি হাতড়ে বলেন, 'কা কা করতে করতে আমরা বের হলাম।' তারপরই কাঁদানে গ্যাসের শেল, গুলির শব্দ, এবং মেডিক্যাল কলেজে রক্তাক্ত তরুণদের আর্তনাদ। স্কুলছাত্রী তাহমিনার ওড়না ছিঁড়ে পানিতে ভিজিয়ে কাঁদানে গ্যাস থেকে চোখ বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন সহযোদ্ধারা।

একজন নীরব সাক্ষীর জীবনকথা

তাহমিনা সালেহ ছিলেন সেই প্রথম ১০ নারীর একজন যারা ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন, কিন্তু এই গল্প তিনি দীর্ঘদিন কাউকে বলেননি, এমনকি তাঁর সন্তানরাও জানতেন না। তাঁর সদ্য প্রকাশিত স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ 'খেরোখাতা'তেই প্রথমবারের মতো বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে এই ইতিহাস। 'ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো' শীর্ষক সাক্ষাৎকারগুচ্ছের অংশ হিসেবে ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তাঁর বনানীর বাসায় সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এই ৮৮ বছর বয়সী দীপ্যমান নারীর।

শৈশব থেকে যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা

১৯৩৮ সালে পুরান ঢাকার আবদুল হাদী লেনে জন্ম নেওয়া তাহমিনা আট ভাইবোনের সংসারে বেড়ে উঠেছেন। রিকশায় করে কামরুন্নেসা স্কুলে যাওয়া তাঁর দৈনন্দিন রুটিন ছিল। ব্রিটিশ আমল, দেশভাগ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধ—এই সবকিছুর ভেতর দিয়েই তাঁর জীবন পথচলা। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের হাড়জিরজিরে মানুষ তিনি নিজ চোখে দেখেছেন।

তাঁর দুলাভাই ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। বিখ্যাত যে চিত্রে এক বালিকা বই পড়ছে, সেই মডেলটি ছিলেন তাহমিনা নিজেই। জয়নুল আবেদিন তাঁর জন্য বই এনে দিতেন—সত্যজিৎ রায়, সুকুমার রায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর রচনা। উচ্চমার্গীয় আলোচনা শুনতে শুনতেই তাঁর মধ্যে শিক্ষার বোধ তৈরি হয়েছে।

বিবাহ ও পরিবার জীবন

তাহমিনার বিয়ের ঘটকালি করেছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান। ১৯৬০ সালে প্রকৌশলী এ কে সালেহের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্বামীর পোস্টিংয়ের সময় স্পিলওয়েরের ওপর বাসা ছিল, যেটিকে তিনি 'আমার নায়াগ্রা ফলস' বলতেন। জয়নুল আবেদিন সেখানে যেতে পছন্দ করতেন, গল্প করতেন এবং ছবি আঁকতেন। তাহমিনার তিন সন্তানের জন্মও সেখানেই হয়েছে।

তাঁর স্বামীর দিক থেকে আত্মীয় ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। 'দেশে বিদেশে' গ্রন্থটি এ কে সালেহের সিলেটের কাজীবাড়িতে লেখা। সৈয়দ মুজতবা আলীকে তাহমিনা স্মরণ করেন একজন রসিক, প্রাজ্ঞ এবং সুন্দর মানুষ হিসেবে, যিনি বহু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন এবং মুখস্থ সঞ্চয়িতা বলতে পারতেন।

মুক্তিযুদ্ধের মর্মান্তিক স্মৃতি

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর কাপ্তাইয়ে অবস্থানকালে ১৫ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা প্রকৌশলী শামসুদ্দীন সাহেবকে ধরে নিয়ে যায়। তাহমিনার স্বামী এ কে সালেহের সামনেই পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করে শামসুদ্দীন সাহেবকে। তারপর স্বামীকে দাঁড় করানো হয়, তিনি জোরে জোরে কলেমা পড়ছিলেন। এক মেজর ইশারা করে বললেন—চলে যাও। 'কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এল,' বলেন তাহমিনা। এই এক মুহূর্তেই তাঁর জীবন বদলে যায়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনেও তাঁর মধ্যে উল্লাস ছিল না, বুদ্ধিজীবী হত্যার খবর শুনে বুক ভেঙে যায়।

পরিবার ও সামাজিক অবদান

চাকরি ছেড়ে ঢাকায় ফিরে ব্যবসা শুরু করেন এ কে সালেহ। মোহাম্মদপুরে বাড়ি হলে তাহমিনা নিজেই নির্মাণ তদারক করেছেন। সন্তানদের খেলতে দিয়েছেন, পড়তেও শিখিয়েছেন। তিন ছেলেমেয়েই বুয়েট থেকে পাস করে আরও পড়াশোনা করেছেন। বড় মেয়ে তাসনিম সালেহ লোপা আইবিএমে চাকরি করেছেন, বড় ছেলে ইশতিয়াক সালেহ যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী, আর ছোট ছেলে আসিফ সালেহ ব্র্যাকের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

স্বামী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সুস্থও হন এবং দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন। ২০০৩ সালে হেপাটাইটিস সি-তে তাঁর মৃত্যু হয়। 'বাপ যে কত সুপারবাপ হতে পারে, ওকে দেখে বুঝেছি,'—তাহমিনার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে এই স্মৃতি বলতে গিয়ে।

বর্তমান জীবন ও চিন্তাভাবনা

আট ভাইবোনের মধ্যে এখন একা তিনি। বলেন, 'সব দিগন্ত বন্ধ। কোনো বন্ধু নেই।' তবু জীবনকে সুন্দর বলেন তিনি। নিয়মিত জীবনযাপন, ভোরে ওঠা, সাধারণ খাবার, বই পড়া, গান শোনা এবং সঞ্চয়িতা কাছে রাখা তাঁর দৈনন্দিন রুটিনের অংশ।

দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মন্তব্যে ভয়ও আছে, আশাও আছে। তরুণদের ওপর আস্থা রাখেন তিনি। সমাজে বিদ্যমান প্রকট বৈষম্য তাঁর দুর্ভাবনার কারণ। বৈষম্য কমানোর জন্য কাজ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেন পুরোপুরি।

ফজলে হাসান আবেদের মতো নিবেদিতপ্রাণ মানুষ তাঁকে আশাবাদী করে। ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। মৃত্যু নিয়ে বলেন, 'দিল্লি হনুজ দূরস্থ নয়, দিল্লি খুব কাছে।' কিন্তু মৃত্যুকে ভয় পান না; বরং প্রস্তুতি নিতে চান। জিনিসপত্র বিলিয়ে দিতে চান এবং স্বাধীন থাকতে চান শেষ দিন পর্যন্ত।

তাহমিনা সালেহর 'খেরোখাতা' তাই শুধু তাঁর একার নয়, আমাদের সবার। এই গ্রন্থটি একটি জাতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে জীবন্ত করে তুলেছে।