৬৪ বছর আগের চিঠিতে ভাষাসংগ্রামী হামিদা রহমানের অজানা ইতিহাস
পুরোনো চিঠিতে ভাষাসংগ্রামী হামিদা রহমানের ইতিহাস

পুরোনো বইয়ের ভাঁজে মিলল ৬৪ বছরের চিঠি

ব্যক্তিগত লাইব্রেরি গোছাতে গিয়ে পুরোনো বইয়ের ভাঁজে হঠাৎ পাওয়া গেল একটি চিঠি। তারিখ ২৯ নভেম্বর ১৯৬২। চিঠির লেখক মিসেস হামিদা রহমান, যিনি তখন চাঁদপুরের লেডি প্রতিমা মিত্তার গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। প্রাপক লেখকের 'বড় ভাই' হিসেবে চিহ্নিত, যিনি লেখকের শ্বশুর জাইন উদ্দিন আহমেদ বলে ধারণা করা হয়। চিঠিতে হামিদা রহমান কাজের চাপে পড়াশোনা করতে না পারার দুঃখ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু পরীক্ষা দেওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।

কে এই হামিদা রহমান?

চিঠিটি পাওয়ার পর অনুসন্ধান শুরু হয় এই সাহসী নারীর পরিচয় জানতে। হামিদা রহমান ছিলেন একজন ভাষাসংগ্রামী, শিক্ষাবিদ ও লেখক। ১৯২৭ সালের ২৯ জুলাই যশোরে তাঁর জন্ম। ১৯৪৭ সালে তিনি কলকাতার আজাদ পত্রিকায় উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের প্রতিবাদে স্বাধীনতা পত্রিকায় চিঠি লেখেন, যা 'পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা' শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

ভাষা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা

১৯৪৮ সালে হামিদা রহমান রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যশোরে ১১ মার্চের হরতালে ছাত্রীদের মিছিল নেতৃত্ব দেন, পুলিশের দমননীতির মুখেও দাঁড়ান। তাঁর শাড়ির আঁচলে ইটের টুকরো বাঁধা থাকত, যা পুলিশকে ছুড়ে মারতে ব্যবহৃত হতো। ম্যাজিস্ট্রেটের মেয়েকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় তাঁর নামে হুলিয়া জারি হয়, এবং তিনি পুরুষের পোশাক পরে পালিয়ে যান।

শিক্ষা ও পেশাগত জীবন

হামিদা রহমান ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ এবং ১৯৫৮ সালে এমএ পাস করেন। তিনি বিটি ডিগ্রি অর্জন করে ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত চাঁদপুরে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনা ও পুরানা পল্টন গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেন, ইত্তেফাক পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন।

পরিবার ও স্মৃতিচারণ

হামিদা রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্র মোস্তফা আরিফের স্মৃতিতে, তিনি তাঁকে ঢাকায় শহীদ মিনারে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, 'এই শহীদ মিনার আমাদের। আমরাই বুকের রক্ত দিয়ে তৈরি করেছি।' তাঁর জীবনস্মৃতি বইটি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে স্বীকৃত।

নারী সংগ্রামীদের বিস্মৃতি

এই চিঠি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে নারীরা সামনের সারিতে থেকে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, কিন্তু প্রায়ই তাঁদের অবদান বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। হামিদা রহমানের মতো সংগ্রামীদের কাহিনি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।