মায়েরা ঘুমের বিনিময়ে সংসার কেনেন: এক সন্তানের স্মৃতিকথা
মায়েরা ঘুমের বিনিময়ে সংসার কেনেন

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে দাঁড়ালে মনে হয়— এ নদী, মাটি ও আকাশ মিলে একটা জীবন্ত সত্তা। নদের পাড় ঘেঁষে আমাদের গ্রাম টুপকারচর— নামটার মধ্যেই একটা মাটির গন্ধ আছে। গ্রীষ্মে— মুকুল ঝরে পড়ার ও কাঁঠালের ভারি মিষ্টি গন্ধ হাওয়ায় ভাসে। আর সেই বাতাসে মিশে আছে শৈশবের দিনগুলি। এ গ্রামেই আমার জন্ম ও বড় হওয়া।

যৌথ পরিবারের সংসারে আমরা সাত ভাই ও চার বোন। বাবা ছিলেন মাটির মানুষ, কৃষিকাজ করতেন। কিন্তু সংসারের আসল কাণ্ডারি ছিলেন মা। আজকাল যতবার গ্রামের কথা মনে হয়, মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে আগে। তারপর ব্রহ্মপুত্র, শ্যামল মাঠ, বাঁশঝাড়, সন্ধ্যায় পাখির কলরব ও কলার বাগান- যেন মা আর এ গ্রাম আলাদা কিছু নয়।

মায়ের রান্নার হাত ও সংসার

মায়ের রান্নার হাত ছিল অদ্ভুত। প্রতিদিন রান্না করতেন। গরুর মাংসের তরকারি, মাছের ঝোলের স্বাদ এখনো ভাবায়। এত বড় সংসার, আব্বা মাঝে মাঝে প্রকাণ্ড কাজ করতেন। প্রায় প্রতি মাসেই প্রতিবেশীর সঙ্গে মিলে গরু অথবা মহিষ জবাই করতেন। মাংস নেওয়ার পর গরু-মহিষের মাথা আব্বা নিয়ে নিতেন। মা বড় পাতিলে রান্না করতেন। আমরা ভাইবোন রান্নাঘরে বসে থাকতাম, মা গল্প করতেন। আমাদের মনে হতো আজ ঈদের দিন- কত আনন্দ-মজা করতাম। মা ভোর পাঁচটায় উঠতেন। নিঃশব্দে উঠান ঝাড়ু দিতেন, উনুন ধরাতেন ও গরু-ছাগলকে খড় দিতেন। সূর্য ওঠার আগেই তার অর্ধেক দিনের কাজ শেষ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মায়ের নিঃশব্দ ত্যাগ

আমি ময়মনসিংহ থেকে যত রাতেই আসি, ঘরের দরজায় একবার মা বলে ডাকলে সঙ্গে সঙ্গে মা বলতেন মোশারফ এসেছ। দরজা খুলে দিয়ে বলতেন হাত-মুখ ধুয়ে ভাত খাও। আমার মনে আছে— একবার মাঝরাতে মা বসে আছেন উঠানে- একা। চাঁদের আলোয়। হাতে কারো জামা সেলাই করছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'মা, ঘুমাওনি?' মা তাকালেন। হাসলেন। বললেন, 'তুই ঘুমা বাবা। তোর পরীক্ষা আছে কাল।' আমি জানতাম— 'একটু পরে' আসত না কখনো। ভোর হয়ে যেত। মায়েরা বোধহয় ঘুমের বিনিময়ে সংসার কেনেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিক্ষার প্রতি মায়ের অদম্য জেদ

টুপকারচর গ্রামে তখন স্কুল ছিল একটাই। বর্ষার সময় রাস্তা কাদায় থইথই। হাঁটু পর্যন্ত পানি হতো। তবু মা প্রতিদিন সকালে আমাদের তৈরি করতেন। নিজে কখনো বেশিদূর পড়াশোনা করেনি, কিন্তু লেখাপড়ার ব্যাপারে একটুও ছাড় দিতেন না। 'বইয়ের চেয়ে বড় সম্পদ নাই। এইটা কেউ নিতে পারে না।' এই কথাটা মা কতবার বলেছেন — আমার হিসাব নেই। বাবাও বলতেন, পড়ালেখা কর মানুষের মতো মানুষ হও। মা সবাইকে স্কুলে পাঠাতেন। নিঃশব্দ জেদ ছিল তার। বাতাসের মতো— দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।

অভাব ও আত্মত্যাগের গল্প

সংসারে অভাব ছিল। লুকানো অভাব। মা কখনো বলতেন না— 'আজ চাল নেই' বা 'তেল শেষ'। মায়ের থালায় খাবার থাকত অল্প। মাছের কাঁটা থাকত, মাংস থাকত না। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, 'কাঁটার কাছের মাংসটাই সবচেয়ে সুস্বাদু'। এখন বুঝি মায়েদের আত্মত্যাগ। ঈদে নতুন জামা হতো আমাদের। মায়ের হতো না। বলতেন, 'আমার পুরনো শাড়িটাই ভালো আছে'। একবার মাকে একটা শাড়ি কিনে দিয়েছি। নিজের টিফিনের টাকা জমিয়ে। শাড়িটা কিনে আনার পর মা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর বললেন, 'তুই না খেয়ে এইটা কিনেছিস?' আমি বললাম, 'না মা, জমিয়েছি।' মা শাড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কিছু বললেন না। সেই শাড়িটা তিনি পরতেন শুধু ঈদের দিন। যত্ন করে রাখতেন বাকি দিন। মারা যাওয়ার পর সেই শাড়িটা পাওয়া গেছে ভাঁজ করা, আলমারির কোণে।

বন্যার সময় মায়ের দৃঢ়তা

১৯৯৬ সালে, বন্যা হলো। ঘরের ভেতর হাঁটু সমান পানি। সবাই উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিল। মা কিন্তু আগে ঘরের জিনিসপত্র সরালেন— বই-কাগজপত্রগুলো পলিথিনে মুড়িয়ে মাথায় তুলে নিলেন। কেউ জিজ্ঞেস করল, 'মা, চাল-ডাল নেবে না?' বললেন, 'চাল-ডাল আবার কেনা যাবে। কাগজ একবার ভিজলে শেষ'। সেই রাতে বন্যার পানিতে ঘেরা ঘরে— একটা কেরোসিনের বাতির আলোয়, মা সবাইকে কাছে বসিয়ে গল্প বললেন। ভয় পেতে দিলেন না। সকালে পানি নামতে শুরু করলে সবার আগে নামলেন— কাদায় পা দিয়ে, ঘর পরিষ্কার করতে।

মায়ের সন্তানদের সাফল্য ও নম্রতা

এগারোটি সন্তান মানুষ করতে গিয়ে মা নিজেকে কতটা দিয়েছেন— সেটা এখন বুঝতে পারছি। আমার নারায়ণগঞ্জে একমি আইটি সেকশনে প্রথম চাকরি হলো মা হাসলেন। কাশেম হাফেজ হলো, এনামুল মাওলানা হলো, মিজানুর ইঞ্জিনিয়ার হলো। মা হাসলেন। বোনেরা সবাই সুখী। মা হাসলেন। প্রতিটা সাফল্যে মা হাসতেন— কিন্তু গর্ব করে বলে বেড়াতেন না। পাশের বাড়ির মা যেভাবে বলেন— 'আমার ছেলে এটা হয়েছে, সেটা হয়েছে'— সেভাবে নয়। বরং বলতেন, 'আল্লাহর রহমত'। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, 'মা, তুমি কি কখনো নিজের জন্য কিছু চেয়েছিলে?' মা একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, 'তোরা যখন ভালো থাকিস— আমি তখন ভালো থাকি। এটাই তো আমার চাওয়া'।

স্ট্রোক ও হাসপাতালের দিনগুলি

একদিন স্ট্রোকের খবরটা এলো শীতের সকালে। আমি তখন জামালপুর স্টেশনে। ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মপুত্র ট্রেনের অপেক্ষায়। ফোন করেছিল ছোট ভাই কাশেম, গলা কাঁপছিল। 'দাদা, মা হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেছেন। কথা বলতে পারছেন না'। মাকে প্রথমে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। ডাক্তার রেফার্ড করলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে রাত হলো। করিডোরে সাদা আলোয় ভাইবোনেরা জড়ো হচ্ছে একে একে। দূর থেকে, কাছ থেকে— সবাই আসছে। নিউরোলজি ওয়ার্ড।

হাসপাতালের গন্ধটা আলাদা— ওষুধ, জীবাণুনাশক, আর একটা অদৃশ্য ভয়ের গন্ধ মিলিয়ে। আমি রিপোর্ট নিয়ে দৌড়াচ্ছি, কেউ ডাক্তারের পেছনে, কেউ ওষুধ কিনতে বাইরে। এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্ক। সিটিস্ক্যান, রক্ত পরীক্ষা, ইসিজির লাইন, অপেক্ষা, আবার লাইন। মার পাশের বেডে একজন বৃদ্ধ মানুষ শুয়ে আছেন। চোখ বন্ধ। কিন্তু পাশে কেউ নেই। সকাল থেকে কেউ আসেনি। নার্স এসে ওষুধ দিয়ে চলে গেল। মানুষটার হয়তো অনেক টাকা আছে, অনেক সম্পদ আছে। কিন্তু একজন মানুষ নেই যে হাতটা ধরে বসে থাকবে। আবার এমনো রোগী দেখেছি ওষুধ ক্রয়ের টাকা নাই কিন্তু আত্মীয়স্বজন হাসপাতালে এসে রান্না করে খেয়েছে। আত্মীয়স্বজনদের পাশে পেয়ে রোগী অনেকাংশে সুস্থ হয়েছে। আমরা মায়ের বিছানার জায়গা ঘিরে আছি। মা শুধু সন্তান মানুষ করেননি। মানুষের মতো মানুষ তৈরি করেছেন। যারা বিপদে দূরে সরে যায় না, কাছে আসে।

মায়ের শেষ দিনগুলি

রাতের শেষ দিকে মা একটু নড়লেন। সাহেদা আপা চিৎকার করে উঠল। সবাই দৌড়ে এলাম। মা চোখ খুললেন। ঘোলাটে দৃষ্টি। চেনার চেষ্টা করছেন। এনামুল ঝুঁকে পড়ল। 'মা, আমি এনামুল'। মায়ের ঠোঁট কাঁপল। শব্দ বের হলো না। কিন্তু হাতটা উঠে এলো ধীরে ধীরে। এনামুলের মাথায় হাত রাখলেন। এনামুল কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। পারল না। ডুকরে কেঁদে উঠল। পাশে কাশেম কাঁদছে, সাহেদা ও নূরবানু আপা কাঁদছে। মায়ের সামনে কান্না লজ্জার নয়।

মা সুস্থ হয়েছিলেন। আংশিক। পনের দিন পর বাড়ি ফেরা। উঠনে বসে নাতিনাতনিদের গল্প বলতেন। দোয়া করতেন প্রতিদিন। মা বলতেন, 'বিপদে ভেঙে পড়বি না'। মা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ছয় মাস হলো।

উপসংহার: মায়ের স্মৃতি আজও অমলিন

টুপকারচর গ্রামে ব্রহ্মপুত্র এখনো বয়ে চলছে। সবুজ মাঠ এখনো সবুজ। কিন্তু বাড়িটা অন্যরকম। রান্নাঘরে আর সেই গন্ধ নেই। আলমারির কোণে একটা শাড়ি ভাঁজ করা পড়ে আছে— আমার কেনা শাড়ি। মনে হয়— এ বাতাসে, নদীর শব্দে ও মাটির গন্ধে যেন মা এখানো আছেন।

লেখক: প্রভাষক, শিল্পকলার ইতিহাস, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন চারুকলা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ।