নারী ও শিশুবিষয়ক ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেছেন, সরকার প্রত্যক্ষ নগদ সহায়তা, সমন্বিত ডাটাবেজ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক কল্যাণ নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। একইসঙ্গে তিনি সুবিধাভোগী নির্বাচনে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার কথাও স্বীকার করেন।
ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির এই নেত্রী ও প্রথমবারের মতো মন্ত্রী কল্যাণ কর্মসূচিতে স্বজনপ্রীতি, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের সংস্কার, প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রবেশগম্যতা এবং দায়িত্ব নেওয়ার পর চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি: যোগ্যতা নাকি পারিবারিক ঐতিহ্য?
এটি অনেক কিছুর সমন্বয়। আমি আমার বাবার প্রভাব অস্বীকার করতে পারি না, তবে দলের আস্থা ও আমার নিজের কাজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাবা যদি পথ দেখাতেন না, দল সমর্থন না করত, অথবা আমি জনগণের মধ্যে আন্তরিকভাবে কাজ না করতাম, তাহলে আজ এখানে আসতাম না।
বাবার রাজনীতি কীভাবে ক্যারিয়ার গড়েছে?
বাবা আমার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছেন। আমি তার রাজনৈতিক পথ ও আদর্শ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। আমি বিশ্বাস করি, তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন, তা অনুসরণ করলে আলাদা কিছু তৈরি করার প্রয়োজন নেই। আমি আজকের প্রেক্ষাপটে সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
সুরক্ষা জালে কোটি কোটি টাকা, তবু দরিদ্ররা বাদ পড়ে কেন?
অতীতের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সুবিধাভোগী তালিকা প্রস্তাবে স্বজনপ্রীতি। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, কার্ড কারো নামে থাকলেও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট অন্য কারো নামে থাকত। ফলে টাকা অন্য জায়গায় চলে যেত। আমরা এখন এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করছি এবং জিটুপি সিস্টেম ও সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ লেনদেন করে মধ্যস্বত্বভোগীদের সরানোর চেষ্টা করছি।
প্রভাবশালী, সচ্ছল ব্যক্তিরা ফ্যামিলি কার্ড পাচ্ছেন বলে অভিযোগ
যখনই আমরা অভিযোগ পাই, তাৎক্ষণিক তদন্ত করি। এখনও অনেক তথ্য ম্যানুয়ালি সংগ্রহ করা হয়, তাই ফিল্ড লেভেলে ভুল হয়। কখনো কখনো পাকা বাড়ির অধিবাসীকে অস্থায়ী বাড়ির তালিকায় দেখানো হয়। আমরা এসব ত্রুটি সংশোধন করছি, তবে ফিল্ড-প্রশাসন পর্যায়ে সততা জরুরি বলে আমি বিশ্বাস করি।
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য কি কর, জমি বা রাষ্ট্রীয় ডাটাবেজের সাথে সমন্বিত হবে?
আমাদের এখনো কেন্দ্রীভূত ডাটা সেন্টার নেই যেখানে সব তথ্য তাৎক্ষণিক পাওয়া যাবে, তবে আমরা সেই দিকে এগোচ্ছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য সমন্বয় করে 'ফ্যামিলি ট্রি' ডাটাবেজ তৈরি করছি, যাতে সুবিধা বিতরণে কার্যকারিতা আসে ও দ্বৈততা এড়ানো যায়।
ফ্যামিলি কার্ডের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী?
পরবর্তী পাঁচ বছরে আমরা প্রায় চার কোটি মানুষের তথ্য সংগ্রহ করতে চাই। লক্ষ্য শুধু ভাতা দেওয়া নয়, বরং কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করাও।
কল্যাণ কর্মসূচি কি ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হয়?
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে, কিন্তু ভোটাররা এখন অনেক বেশি সচেতন। আমাদের উদ্দেশ্য মানব উন্নয়ন, ভোট ব্যাংকের রাজনীতি নয়। গ্রামের কয়েকটি পরিবারের জীবন উন্নত হলে পুরো গ্রাম উপকৃত হয়।
প্রতিবন্ধীদের জন্য সুবিধা অপ্রতুল, কী করা হচ্ছে?
অনেক ক্ষেত্রে কার্যকরী কিছু নেই। এমনকি মন্ত্রণালয়ের ভবনেও র্যাম্প ও সঠিক ওয়াশরুম নেই। আমরা ভবন ও পরিবহনে প্রবেশগম্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের জন্য আইনি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কাজ করছি।
প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য এখনও স্থানীয় প্রতিনিধির সুপারিশ লাগে, কি পরিবর্তন আসছে?
হ্যাঁ, সেই সংস্কৃতি বদলাতে হবে। তথ্য সরাসরি ডাটাবেজ ও এনআইডি সিস্টেমের সাথে যুক্ত হলে রাজনৈতিক সুপারিশ বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই সুবিধা সরাসরি প্রাপকের কাছে পৌঁছাবে।
ভাতা নির্ভরতা কমানোর রোডম্যাপ আছে?
অবশ্যই। আমরা মানুষকে ভাতার ওপর নির্ভরশীল রাখতে চাই না। আর্থিক সহায়তা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। আমরা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করছি ও 'এক গ্রাম, এক পণ্য' উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি করছি।
পথশিশু ও ভবঘুরেদের পুনর্বাসনে কী পদক্ষেপ?
আমাদের পদ্ধতি তিন স্তরের: প্রথমে খাদ্য ও মৌলিক শিক্ষা, তারপর দক্ষতা উন্নয়ন, শেষে কর্মসংস্থান। চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করছি এবং পরিমাণের চেয়ে মানের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি।
কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে ভিড় ও অব্যবস্থাপনা
অনেক সংশোধন কেন্দ্রের অবস্থা খুবই খারাপ। কিছু ক্ষেত্রে সংশোধনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও সংশোধন প্রয়োজন। আমরা বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যালোচনা করছি এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র চিহ্নিত করছি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় বাধা?
বাইরে থেকে যা সমস্যা মনে হয়েছিল, ভিতরে গিয়ে তা আরও খারাপ দেখা গেছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে জটিলতা আছে। ১৭ বছরে গড়া সংস্কৃতি তিন মাসে বদলানো সম্ভব নয়। তবে আমরা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা করছি এবং ধীরে ধীরে সেই মানসিকতা বদলাচ্ছি।



