গ্রীষ্মের তীব্র গরমে পানিশূন্যতা, পেশী টান ও হিটস্ট্রোকের পাশাপাশি একটি কম আলোচিত কিন্তু উদ্বেগজনক উপসর্গ দেখা দিচ্ছে—‘দমবন্ধ’ হয়ে আসার অনুভূতি। সম্প্রতি শত শত মানুষ এই সমস্যায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি হচ্ছেন। তীব্র গরমের কারণে মানুষ শ্বাস নিতে পারছেন না বলে অনুভব করছেন, যা আতঙ্কের সৃষ্টি করছে।
আর্দ্র আবহাওয়ায় কেন শ্বাসকষ্ট হয়?
ভারতের অ্যাপোলো হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. নিখিল মোদি বলেন, ‘উচ্চ আর্দ্রতা বাতাসের উপাদানগত গঠন পরিবর্তন করে দেয়, ফলে শ্বাসকষ্ট অনুভূত হয়।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, আর্দ্রতা বেশি হলে বাতাস জলীয় বাষ্পে ভারী হয়ে যায় এবং অক্সিজেনের অণু স্থানচ্যুত হয়। যদিও অক্সিজেনের শতাংশ স্থিতিশীল থাকে, তবু ঘন আর্দ্রতা শ্বাসনালীর প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে ফুসফুসে বাতাস টানতে শ্বাস-প্রশ্বাসের পেশীগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়।
গরম ও ঘন বাতাস ফুসফুসের ‘গ্রুপ সি নার্ভ ফাইবার’ নামক স্নায়ু গুচ্ছকে উত্তেজিত করে। এই সি-ফাইবার সক্রিয় হলে মস্তিষ্কে বার্তা যায় যে শরীর হুমকিতে রয়েছে, ফলে শ্বাসনালী সংকুচিত হয় (ব্রঙ্কোস্পাজম)। এর ফলে তীব্র দমবন্ধ অনুভূতি হয়।
গরম ও শ্বাসযন্ত্রের চাপে হৃদপিণ্ডের ওপর প্রভাব
মানব শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রক্তনালী প্রসারিত করে ত্বকে রক্ত ঠেলে দেয়, যাতে ঘামের বাষ্পীভবনে শরীর ঠান্ডা হয়। কিন্তু উচ্চ আর্দ্রতায় ঘাম বাষ্পীভূত হতে পারে না, ফলে শীতলীকরণ প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। হৃদপিণ্ড তীব্রভাবে পাম্প করতে শুরু করে, যা হৃদস্পন্দন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এতে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যায়, ফলে ফুসফুসের গতি বাড়ে। বিশ্রামে থাকা অবস্থায়ও শ্বাস-প্রশ্বাসের হার প্রতি মিনিটে ১২-২০ বারের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এটি শ্বাসকষ্ট হিসেবে প্রকাশ পায়, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্রুত শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতায় রূপ নিতে পারে।
গ্রীষ্মকালীন শ্বাসকষ্টের ঝুঁকিতে যারা
- অ্যাজমা ও অ্যালার্জি: গরম ও থমথমে বাতাসে ওজোন, পার্টিকুলেট ম্যাটার ও পরাগরেণু জমে শ্বাসনালী ফুলিয়ে তোলে, যা তীব্র অ্যাজমা অ্যাটাকের কারণ হয়।
- সিওপিডি ও ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস: ফুসফুস থেকে বাতাস বের করতে সমস্যা হয়; দ্রুত ও অগভীর শ্বাসে তাজা বাতাস প্রবেশের জায়গা থাকে না, যা হিট এক্সহশট বাড়িয়ে দেয়।
- হৃদরোগী: তাপের চাপে হৃদপিণ্ড অতিরিক্ত খাটলে ফুসফুসে তরল জমতে পারে, ফলে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
- বয়স্ক ও স্থূল ব্যক্তি: ফুসফুসের ক্ষমতা কমে যাওয়া ও তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ধীর গতির কারণে দ্রুত শ্বাসযন্ত্রের ক্লান্তিতে আক্রান্ত হন।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
ভারতের নয়াদিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালের কো-ডিরেক্টর ও পেডিয়াট্রিক পালমোনোলজিস্ট ড. ধীরেন গুপ্ত বলেন, ‘এসি রুমে ১৫-৩০ মিনিট বসে থাকার পরও যদি শ্বাসকষ্ট না কমে, তবে তা অবহেলা করা যাবে না।’ জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন যদি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দেয়:
- ঠোঁট, জিহ্বা বা আঙুলের ডগায় নীলচে আভা (সায়ানোসিস)।
- শ্বাস না নিয়ে পুরো বাক্য বলতে না পারা।
- বুকে শাঁ শাঁ আওয়াজ (হুইজিং) বা তীব্র চাপ।
- হঠাৎ বিভ্রান্তি, অস্পষ্ট কথা বা তীব্র মাথা ঘোরা।
- পালস অক্সিমিটারে অক্সিজেনের মাত্রা ৯৩% এর নিচে।
গরমে শ্বাসকষ্ট প্রতিরোধের উপায়
ড. মোদি ও ড. গুপ্ত ফুসফুস সুরক্ষায় নিম্নলিখিত পরামর্শ দিয়েছেন:
- বায়ুর গুণমান ও আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ: আর্দ্রতা ৭০% এর ওপরে হলে বাইরের কার্যকলাপ সীমিত করুন, বিশেষ করে সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।
- তাপমাত্রা পরিবর্তনের আগে ওষুধ: এসি রুম থেকে বের হওয়ার ১৫-৩০ মিনিট আগে ব্রঙ্কোডাইলেটর রেসকিউ ইনহেলার ব্যবহার করুন (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)।
- পানি পান: প্রচুর পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় পান করুন। পানিশূন্যতা শ্বাসনালীর শ্লেষ্মা ঘন করে, যা অক্সিজেন শোষণ কঠিন করে।
- নিয়ন্ত্রিত ইনডোর পরিবেশ: ঘরের আর্দ্রতা ৪০-৫০% রাখতে এয়ার কন্ডিশনার ও ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন। যান্ত্রিক শীতলীকরণ না থাকলে ফ্যানের নিচে ঠান্ডা ভেজা কাপড় ব্যবহার করে শরীর ঠান্ডা রাখুন।
তীব্র তাপপ্রবাহ এখন শুধু পানিশূন্যতার নয়, সরাসরি শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। আর্দ্রতা কীভাবে শ্বাসনালী অবরুদ্ধ করে তা বোঝা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে গ্রীষ্মের গরমেও শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
সূত্র: এনডিটিভি



