ভেজাল খাদ্য উৎপাদন: কঠোর শাস্তি ও আইন সংশোধনের জরুরি প্রয়োজন
অস্বাস্থ্যকর উপায়ে পচা চিনির শিরা ও কেমিক্যাল মিশিয়ে গোপনে খাদ্যপণ্য তৈরি করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে সেগুলো জব্দ করে কারখানা সিলগালাও করা হলেও, মালিকরা সামান্য জেল বা জরিমানা দিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও নতুন স্থানে একই অপকর্ম শুরু করছে। এই সমস্যা থেকে বাঁচার একমাত্র সমাধান হতে পারে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট বা কঠোর শাস্তির বিধান।
ভোক্তা সচেতনতা ও আইনের প্রয়োগের অভাব
আমাদের দেশে ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে, শুধু নিরাপদ খাদ্যে নয়, ভোক্তা অধিকার নিয়েও। আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে না হওয়ায় এই সচেতনতার অভাব আরও প্রকট। ভোক্তা কিভাবে সচেতন হবে? যখন কোনও অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর হবে, তখন সেই বার্তা সবার কাছে পৌঁছাবে এবং মানুষ সচেতন হতে বাধ্য হবে।
ভেজাল খাদ্যের জন্য অন্তত পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ যাবজ্জীবনের বিধান থাকা জরুরি। অনেকে তো মৃত্যুদণ্ডের দাবিও তুলছেন। এই আইনের প্রয়োগগুলো যদি যথাযথভাবে হতো এবং কঠিন শাস্তির বিধান থাকতো, তাহলে আমাদের এই সমস্যাগুলো অতটা থাকতো না এবং ভোক্তা অবশ্যই আরও বেশি সচেতন হতো।
ভোক্তা অভিযোগ প্রক্রিয়ার জটিলতা
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন থাকলেও এর প্রয়োগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অনীহা রয়েছে। শিক্ষিত মানুষ বা সরকারি কর্মকর্তারাও দ্বিধায় ভোগেন যে, অভিযোগ করলে আদৌ কোনো সুরাহা হবে কিনা। অভিযোগ অনলাইনে করা গেলেও শুনানিতে সশরীরে উপস্থিত হওয়া বাধ্যতামূলক। শুনানিতে না গেলে অভিযোগ প্রমাণ করা অসম্ভব। এই ঝক্কি-ঝামেলার কারণে অনেকেই অভিযোগ করতে চান না।
আইনের ত্রুটি ও সংশোধনের প্রয়োজন
২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার আইন এবং ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন— দুটিই করা হয়েছিল তাড়াহুড়ো করে, কোনও প্রকার ভেটিং বা জনমত যাচাই ছাড়াই। আইনগুলো রাতারাতি হলেও তৈরি হয়েছে, এটি প্রশংসনীয়। কিন্তু এখন এগুলোর সংশোধন জরুরি। ত্রুটিগুলো দূর করে শাস্তির বিধান কঠোর করার মাধ্যমে আইনটিকে আরও কার্যকর করতে ২০১৬ সালে সংশোধনীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
দুর্ভাগ্যবশত, ২০১৬ সালে তৈরি সেই খসড়াটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিদফতর এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ফাইলে এটি গত ১০ বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ এই সংশোধনী পাস করা তিন দিনের ব্যাপার মাত্র। আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার ভয়েই এই দুই আইনের খসড়া সংশোধনী কখনও পাস হবে না বলে মনে করা হয়।
ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ
ভোক্তা আইনকে ‘ল্যাংড়া’ বা ‘খোঁড়া’ আইন বলা হয়। একটি সহজ উদাহরণ— একটি বিস্কুটের প্যাকেটে চারটি কিসমিসের ছবি দেখে কিনলে, ভেতরে মাত্র একটি বা দুটি পাওয়া যায়। এটি সুস্পষ্ট ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন। প্যাকেটের গায়ে বাটার ব্যবহারের কথা লেখা অথচ ভেতরে ডালডা বা পাম অয়েল— এসব ক্ষেত্রে ভোক্তা প্রতারিত হচ্ছেন।
ভোক্তা অধিকার অধিদফতরের পণ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বা পর্যাপ্ত তহবিল নেই। তারা কেবল স্পট মামলা বা অভিযোগের ভিত্তিতে কাজ করে। ফলে প্রতারণা করেও কোম্পানিগুলো পার পেয়ে যাচ্ছে এবং ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হচ্ছে। এভাবেই ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন, আর বিক্রেতারা লাভবান হচ্ছেন।
লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ



