ইফতারে জিলাপিতে বিষাক্ত হাইড্রোজ মেশানোর ভয়াবহতা, কিডনি-ক্যান্সারের ঝুঁকি
জিলাপিতে হাইড্রোজ মেশানো: স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সচেতনতা

ইফতারে জিলাপিতে হাইড্রোজ মেশানোর উদ্বেগজনক প্রবণতা

রোজার পবিত্র মাসে ইফতারের টেবিলে জিলাপি একটি অত্যন্ত প্রিয় ও জনপ্রিয় খাবার। সারা দিন রোজা রাখার পর মিষ্টি ও গরম গরম জিলাপি খেলে মন ভরে যায় অনেকের। খেজুর, বেগুনি ও ছোলার পাশাপাশি জিলাপি থাকলে ইফতারের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই জিলাপিকেই দৃষ্টিনন্দন ও দীর্ঘ সময় ধরে মুচমুচে রাখার জন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা হাইড্রোজ নামের একটি ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করছেন, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রাসায়নিকের প্রভাবে কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগও হতে পারে।

হাইড্রোজ কী এবং এর ব্যবহার

হাইড্রোজ, যার পূর্ণ নাম সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট, একটি শক্তিশালী রাসায়নিক বিজারক ও ব্লিচিং এজেন্ট। এটি মূলত টেক্সটাইল শিল্পে কাপড়ের অতিরিক্ত রং তোলা বা ভ্যাট ডাইং প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কাগজ শিল্পে মণ্ড সাদা করতে এবং খাদ্য শিল্পে চিনি বা গুড় পরিষ্কার ও উজ্জ্বল করতেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু এই রাসায়নিক খাবারের সঙ্গে মিশ্রিত হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

রাজধানীর বাজারে অসাধুতা ও ভোক্তাদের উদ্বেগ

রাজধানী ঢাকার নানা এলাকা ও পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন দোকানে জিলাপি তৈরির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সদরঘাট, লক্ষ্মীবাজার, রায়সাহেব বাজার ও কলতা বাজারের মতো স্থানে সরেজমিনে দেখা গেছে, অসাধু কিছু বিক্রেতা জিলাপিতে হাইড্রোজ মিশিয়ে দিচ্ছেন। এতে খাবারের মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

রায়সাহেব বাজারের দোকানি লুৎফার রহমান বলেন, "আমরা এটাকে খাবারের সোডা মনে করি। এটি ব্যবহার করলে জিলাপি মচমচে হয় এবং দেখতে স্বচ্ছ দেখায়। এটি যে ক্ষতিকর হতে পারে, তা আমাদের জানা ছিল না।" আরেক দোকানি আব্দুল করিম যোগ করেন, "বাজারে অনেকেই এই উপাদান ব্যবহার করে। আমরা মূলত অন্যদের দেখে ব্যবহার করেছি। এতে জিলাপি দ্রুত ফুলে ওঠে এবং দেখতে সুন্দর লাগে বলে ক্রেতারাও বেশি পছন্দ করেন।"

জিলাপি কিনতে আসা মোক্তার আহম্মেদ তার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "পরিবারের সবাই জিলাপি খুব পছন্দ করে, তাই প্রতিদিন কিনতে হয়। কিন্তু পত্রপত্রিকায় দেখি জিলাপি মচমচে বা উজ্জ্বল করতে হাইড্রোজের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। আমরা অনেকেই জানি না কোন জিলাপিতে বিষ মেশানো আর কোনটাতে নয়। এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে কবে?"

পুরান ঢাকার বাসিন্দা ও স্কুল শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, "আগে জিলাপি মানেই ছিল একটা আলাদা ঘ্রাণ আর বিশুদ্ধতা। এখন জিলাপির চাকচিক্য বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু রাসায়নিকের ভয়ে নিশ্চিন্তে খাওয়ার উপায় নেই। প্রশাসনের উচিত নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা, যাতে সাধারণ মানুষ অন্তত ইফতারের মতো পবিত্র একটি আয়োজনে ভেজালমুক্ত খাবার পায়।"

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, "হাইড্রোজ মূলত দেশে আমদানি করা হয় সুতার ফ্যাক্টরিতে ব্যাবহারের জন্য। কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের বিষয় বর্তমানে এটি জিলাপি, গুড় ও চিনিতে অপব্যবহার হচ্ছে। যখন এটি ব্যবহার করা হয়, তখন খাবার খাওয়া বা ধূমপান করা সম্পূর্ণ নিষেধ। এমন একটি ভয়ঙ্কর পদার্থ তারা জিলাপির সঙ্গে মিশাচ্ছে! আমরা নিয়মিত তল্লাশি চালাচ্ছি, অপরাধীদের জরিমানা ও শাস্তি দিচ্ছি।"

হাইড্রোজ বিক্রি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এই পদার্থ বাংলাদেশ সরকার আমদানি করে সুতার ফ্যাক্টরির জন্য, এটি আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের পোশাক শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা অভিযানের মাধ্যমে এগুলো নির্মূল করার চেষ্টা করছি।"

ভোক্তারা কীভাবে সচেতন হবে সে বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন, "ভোক্তারা সরাসরি দোকানিকে জিজ্ঞেস করবে এই জিলাপিতে হাইড্রোজ আছে কি না। যদি দেওয়া থাকে তাহলে তাহলে ওই দোকান থেকে জিলাপি ক্রয় করা পরিহার করবে। এটা আসলে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করার কোনও বিষয় নয়। আমাদের কাছে যে কিট আছে সেটা দিয়ে শুধু গুড়ের হাইড্রোজ ধরা যায়, জিলাপির হাইড্রোজ ধরার জন্য এখনও কোনও কিট তৈরি হয়নি।"

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের সঙ্গে হাইড্রোজ মেশানো স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি শরীরে প্রবেশ করলে মুখ ও গলায় জ্বালা, বমি, পেটব্যথা ও হজমজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে পাকস্থলির ভেতরের অংশে ক্ষতি এমনকি শ্বাসকষ্টের মতো গুরুতর সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এছাড়াও কিডনি ড্যামেজ ও ক্যানসারের মতো রোগ হতে পারে। খাবারে এ ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

হাইড্রোজ ছাড়া ঘরেই তৈরি করুন নিরাপদ জিলাপি

হাইড্রোজের ভয় থেকে মুক্ত থাকতে চাইলে ঘরেই সহজে তৈরি করতে পারেন নিরাপদ ও সুস্বাদু জিলাপি। নিচে একটি সহজ রেসিপি দেওয়া হলো:

প্রয়োজনীয় উপকরণ:

  • গোলা তৈরির জন্য: এক কাপ ময়দা, দুই টেবিল চামচ চালের গুঁড়া (মুচমুচে করতে), এক টেবিল চামচ বেসন, এক টেবিল চামচ চিনি, এক টেবিল চামচ ইস্ট, দেড় টেবিল চামচ টক দই, সামান্য ফুড কালার ও তেল।
  • সিরার জন্য: এক কাপ চিনি, এক কাপের কম পানি, এক চা চামচ লেবুর রস ও কয়েকটি এলাচ।

প্রস্তুত প্রণালি:

  1. ধাপ ১: পারফেক্ট ব্যাটার বা গোলা তৈরি: একটি বড় বাটিতে ময়দা, চালের গুঁড়া, বেসন, চিনি, ইস্ট ও ফুড কালার মিশিয়ে নিন। এরপর এতে টক দই ও দুই টেবিল চামচ তেল দিন। এবার ধীরে ধীরে কুসুম গরম পানি মিশিয়ে একটি মাঝারি ঘনত্বের গোলা তৈরি করুন। গোলাটি ১৫-২০ মিনিট কোনও গরম জায়গায় ঢেকে রাখুন।
  2. ধাপ ২: চিনির সিরা প্রস্তুত: প্যানে চিনি, পানি ও এলাচ দিয়ে জ্বাল দিন। সিরাটি ঘন হয়ে আঠালো হলে লেবুর রস দিয়ে নামিয়ে নিন। লেবুর রস সিরাকে জমে যেতে দেবে না।
  3. ধাপ ৩: ভাজা ও পরিবেশন: একটি প্লাস্টিকের সসের বোতলে জিলাপির গোলা ভরে নিন। ফ্রাইপ্যানে ডুবো তেল গরম করে বোতল চেপে প্যাঁচ দিয়ে তেলের ওপর জিলাপি ছাড়ুন। মাঝারি আঁচে লালচে করে ভেজে তুলে সরাসরি চিনির সিরায় ডুবিয়ে দিন।

এই পদ্ধতিতে তৈরি জিলাপি হবে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর, যা ইফতারের মেজাজকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে।