সিডনিতে নবাবীর কাচ্চি বিরিয়ানি: প্রবাসী বাঙালির স্মৃতি ও শিকড়ের প্রতিচ্ছবি
অস্ট্রেলিয়ার সিডনির গ্লেনফিল্ডের রাস্তায় হেঁটে গেলে নাকে ভেসে আসে জাফরান, ঘি আর গরম মশলার এক অপরূপ সুবাস। প্রবাসী বাঙালিদের ভিড়ে কান পাতলে শোনা যায় তৃপ্তির গল্প, স্মৃতির কথা। উপলক্ষ একটাই—এক প্লেট কাচ্চি বিরিয়ানি। হাজার হাজার মাইল দূরে, এই প্রশান্ত পাড়ের দেশের মাটিতে পুরান ঢাকার সেই আদি ও অকৃত্রিম স্বাদ ফিরিয়ে এনেছেন শেফ সেলিম রেজা। তাঁর হাতের জাদুতে ‘নবাবী’ রেস্তোরাঁর কাচ্চি বিরিয়ানি এখন আর শুধু একটি খাবার নয়, এটি সিডনিতে বসবাসরত হাজারো বাঙালির কাছে এক টুকরা ঢাকা, এক প্লেট স্মৃতি আর শিকড়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
রান্নার শিল্প: হাঁড়ির ভেতরে লুকানো ঐতিহ্য
নবাবীর কাচ্চির অতুলনীয় স্বাদের পেছনে রয়েছে একনিষ্ঠ শ্রম আর শতাব্দীপ্রাচীন রন্ধনপ্রক্রিয়া। মাংসের প্রতিটি টুকরাকে টক দই আর বাছাই করা মশলা দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ম্যারিনেট করে রাখা হয়। এরপর বিশাল হাঁড়ির নিচে মাংস, তার ওপর ভাজা আলু ও পেঁয়াজের বেরেস্তার স্তর দেওয়া হয়। সব শেষে বিছিয়ে দেওয়া হয় আধা সেদ্ধ করা সুগন্ধি বাসমতী চালের আস্তরণ। এরপর হাঁড়ির মুখ আটা দিয়ে এমনভাবে বন্ধ করা হয়, যাতে এক বিন্দু বাষ্পও বাইরে যেতে না পারে। কয়লার হালকা আঁচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলে এই ‘দম’ রান্না। এই ধীরগতির রান্নাতেই মাংস হয়ে ওঠে তুলতুলে নরম, আলু হয় রসে টইটম্বুর আর চালের প্রতিটি দানায় মিশে যায় মশলার পুরো সুগন্ধ।
ভোজনরসিক সিডনির ক্যাম্পবেল্টাউন ট্যাক্স স্টোরের প্রধান অ্যাকাউন্ট্যান্ট কামরুল হাসানের মন্তব্য: ‘মাংসটা মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়, আলুর ভেতরটাও রসে ভরপুর। প্রতিবার এসে একই স্বাদ পাই, এটাই নবাবীর সবচেয়ে বড় গুণ।’
এক জাদুকরের গল্প: যেভাবে শুরু হলো এই যাত্রা
এক বিকেলে রেস্তোরাঁর এক কোণে বসে নিজের যাত্রার গল্প শোনাচ্ছিলেন শেফ সেলিম রেজা। তাঁর চোখেমুখে ছিল স্বপ্ন পূরণের তৃপ্তি। ‘বিরিয়ানির এই জাদু তো আর একদিনে আসেনি’—এক গাল হেসে বলা শুরু করেন তিনি। ‘সিডনিতে যখন প্রথম আসি, তখন শেফ হব, এমনটা ভাবিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি টিকে থাকার জন্য কাজ করেছি বিভিন্ন ইতালিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ান রেস্তোরাঁয়। সেখানকার চাপ, কাজের ধরন আর নিখুঁত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আমাকে শিখিয়েছে অনেক কিছু, কিন্তু মনটা সব সময় পড়ে থাকত দেশের স্বাদের জন্য, মায়ের হাতের রান্নার জন্য।’
কাজের সূত্রে অস্ট্রেলিয়ার সেরা সব রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে বিচরণ করলেও সেলিম রেজার আসল অনুপ্রেরণা আসে বাংলাদেশে ছুটিতে গিয়ে। সেই স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন: ‘দেশে এক আত্মীয়ের বাড়িতে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের জন্য কাচ্চি রান্নার আয়োজন চলছিল। আমি দেখলাম, ঢাকার বিখ্যাত ফখরুদ্দিন বাবুর্চির শিষ্য আলমগীর বাবুর্চি রান্না করছেন। বিশাল বিশাল ডেক, মাংসের ভেতর মশলার সেই নিখুঁত মিশ্রণ, বাতাসে জাফরানের গন্ধ—আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, এই বিদ্যা আমাকে শিখতেই হবে। রান্নার ওই বিশাল জগৎটা ছিল আমার জন্য এক মহাসমুদ্রের মতো।’
‘এক চামচ মুখে দিলেই মনে হয়, ঢাকার কোনো বিয়েবাড়িতে বসে খাচ্ছি। এ তো শুধু বিরিয়ানি নয়, এ হলো স্মৃতি!’—বলছিলেন নবাবীতে খেতে আসা সিডনির আবাসন নির্মাতা তালাত মাহমুদ।
প্রবাসীদের চোখে ‘নবাবী’: একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক
নবাবীর এই জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় এখানকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের কথায়। সিডনির নারেলানের গৃহসজ্জা ও সংস্কারসামগ্রী সুপারস্টোর রনি’স হোম ডেপোটের ব্যবস্থাপক বোরহান খান লিমন বলেন: ‘কাজের চাপে প্রায়ই দেশের জন্য মন খারাপ হয়। কিন্তু নবাবীর কাচ্চি খেলে মনে হয় যেন দেশেই আছি। এর স্বাদ, গন্ধ—সবকিছু আমাকে ঢাকার কোনো নামকরা রেস্তোরাঁর কথা মনে করিয়ে দেয়।’
ডেনহ্যাম কোর্টের বাসিন্দা নাবিলা ইসলাম বলেন: ‘সিডনিতে অনেক বিরিয়ানি খেয়েছি, কিন্তু নবাবীর মতো স্বাদ কোথাও পাইনি।’
দিনে দিনে নবাবী শুধু একটি রেস্তোরাঁর গণ্ডি পেরিয়ে সিডনির বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের জন্য একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আকর্ষণীয় খাবার হয়ে উঠেছে। ফলে ঈদ, পূজা বা বাংলাদেশের যেকোনো জাতীয় দিবসে নবাবীর কাচ্চি হয়ে ওঠে প্রবাসীদের প্রাণের চাওয়া। তাদের এই সাফল্যের কারণে নবাবী এখন সিডনির বিভিন্ন স্থানে তাদের শাখা বিস্তার করছে।
শেফ সেলিম রেজার হাতের জাদু আর নিখুঁত ব্যবস্থাপনার কারণে ‘নবাবী’ আজ সিডনিতে বাংলাদেশি খাবারের এক গর্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সততা ও গুণগত মানের কারণে বিদেশের মাটিতেও দেশের ঐতিহ্যকে সগৌরবে প্রতিষ্ঠা করেছে সিডনির হাজারো বাঙালির কাছে নবাবীর এক প্লেট কাচ্চি বিরিয়ানি।
