কুমিল্লায় ইফতারির বাজারে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া: বধূয়া ফুড ভিলেজ থেকে ডায়ানা হোটেল পর্যন্ত জনপ্রিয়তা
কুমিল্লায় ইফতারির বাজারে বৈচিত্র্য ও জনপ্রিয়তা

কুমিল্লায় ইফতারির বাজারে বৈচিত্র্যের জয়গান

কুমিল্লা নগরের ইফতারির বাজারে এবারও দেখা যাচ্ছে স্বাদ ও আয়োজনের নান্দনিক পরিবর্তন। রমজানের পবিত্র মাসে শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেল পর্যন্ত সবখানেই দেশি খাবারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান ও আফগান ঘরানার নানা পদ জায়গা করে নিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ছোলা-বেগুনির সঙ্গে এখন বিরিয়ানি, কাবাব, পোলাও, রোস্টসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাবার ইফতারির টেবিলে শোভা পাচ্ছে।

বধূয়া ফুড ভিলেজের ব্যতিক্রমী আয়োজন

কান্দিরপাড় জিলা স্কুল সড়ক এলাকার বধূয়া ফুড ভিলেজ এবারও শতাধিক ইফতার আইটেম নিয়ে হাজির হয়েছে। ইরানি জিলাপি, গরুর মাংসের কাচ্চি বিরিয়ানি, খাসির রোস্ট, মাটির হাঁড়িতে রান্না করা গরুর মাংস, গরু ও খাসির মাংসের হালিম, খাসি কাবাব, তাওয়া ঝালফ্রাই, সোনালি মুরগি–ডিমসহ আফগানি দুরুস—সব মিলিয়ে তাদের ব্যতিক্রমী আয়োজন ক্রেতাদের নজর কাড়ছে। বিশেষ করে ইরানি জিলাপির সামনে দীর্ঘ লাইন প্রতিদিনই চোখে পড়ছে। ঘি দিয়ে ভাজা প্রতি কেজি ৬০০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই জিলাপি এখন অনেক পরিবারের পছন্দের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে।

রেস্তোরাঁর স্বত্বাধিকারী ফুয়াদ আহমেদ বলেন, ক্রেতাদের রুচি পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখেই প্রতিবছর নতুন পদ যুক্ত করা হচ্ছে। এখন মানুষ শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, নতুন স্বাদ উপভোগের জন্য ইফতারি কিনতে আসেন। তাই স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি পুরান ঢাকা ও বিদেশি স্বাদের আইটেমও রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ১০ টাকার সাধারণ ইফতারি থেকে শুরু করে প্রিমিয়াম আইটেম—সব শ্রেণির ক্রেতার জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ডায়ানা হোটেলের হালিমের জনপ্রিয়তা

নগরের রাজগঞ্জ এলাকার ডায়ানা হোটেল এর খাসির মাংসের হালিম এখনো জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে একই স্বাদ বজায় রাখায় রমজান এলেই হোটেলের সামনে ভিড় বাড়ে। হোটেলটির ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ বলেন, প্রতিদিন ১০০ কেজির বেশি হালিম বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। হালিমের বাইরে গত কয়েক বছরের মতো মাংসজাত খাবার ক্রেতারা বেশি কিনছেন ইফতারের জন্য।

মানুষের রুচির পরিবর্তন

পরিবারের জন্য ইফতারি কিনতে আসা প্রবাসী কামরুল ইসলাম বলেন, আগে ইফতারি মানেই ছিল ছোলা, পেঁয়াজু আর বেগুনি। এখন পরিবারের সদস্যরা নতুন স্বাদের খাবার খেতে চান। কয়েক বছর ধরেই বাসার ইফতারিতে বধূয়া ফুড ভিলেজের মুখরোচক খাবার থাকছে। এ ছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো মানুষের চাহিদার কথা মাথায় রেখে সেভাবে ইফতারি তৈরি করছে।

সানজিদা আক্তার নামের এক তরুণী বলেন, আগের তুলনায় মানুষের রুচির পরিবর্তন ঘটেছে। বাইরের বৈচিত্র্যময় খাবারে মানুষ বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন। আমিও এসেছি মাংস দিয়ে তৈরি কয়েকটি ইফতারি আইটেম কিনতে।

অন্যান্য হোটেলের আয়োজন

শুধু একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠান নয়, নগরের প্রায় সব অভিজাত হোটেলই এবারের রমজানে বিশেষ ইফতারির আয়োজন করেছে। ঝাউতলার অ্যালিট প্যালেস, টমছমব্রিজ এলাকার হোটেল ওয়েসিস, কুমিল্লা ক্লাব, রেড রুফ ইন, সিটি পয়েন্ট কিংবা ছন্দু হোটেলসহ বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বিকেলের পর উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। কান্দিরপাড় এলাকার লাহাম কিচেন প্রতি কেজি ৮০০ টাকায় ঝুরা গরুর মাংসের হালিম বিক্রি করছে।

কান্দিরপাড় এলাকার আতিকুর রহমান বলেন, রোজার সময় বিভিন্ন হোটেল ঘুরে নতুন খাবার খোঁজা যেন একধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে মানুষের। বিশেষ করে মাংসজাত খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। আমরাও কিনছি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর বলেন, ধনাঢ্য ও শিক্ষিত মানুষের শহর হওয়ায় কুমিল্লার ইফতারির ঐতিহ্য শত বছরের পুরোনো। তিন-চার দশক আগে মানুষের ইফতারিতে মূল উপাদান ছিল দই, চিড়া, খই, মুড়ি কিংবা ছোলা, পেঁয়াজু ও বেগুনি। কিন্তু মানুষের রুচির পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অবস্থার উত্তরণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে কয়েক বছর ধরে নতুন নতুন খাবার দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তিনি আরও বলেন, আগে ইফতারিতে হয়তো এত প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু সন্তুষ্টি ছিল। এখন বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের দাপট বেড়েছে, কিন্তু সন্তুষ্টির জায়গাটি আগের মতো নেই।

রোজা শুরুর পর বিকেল গড়াতেই কান্দিরপাড়, ঝাউতলা, টমছমব্রিজ, রাজগঞ্জ, রেসকোর্সসহ প্রতিটি এলাকা সরগরম থাকে। পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের জন্য পছন্দের ইফতারি কিনতে ভিড় করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এই পরিবর্তন শুধু খাবারের বৈচিত্র্য নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।