টমেটো নামের পেছনের ইতিহাস
উদ্ভিদবিজ্ঞানীর মতে, টমেটো একটি ফল। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, প্রতিদিন সালাদে, ভর্তায়, সসে, কিংবা ঝোলে যে টমেটো খাই, তার নাম ‘টমেটো’ হলো কেন? এই লাল, রসালো ফলের নামের পেছনে আছে দারুণ মজার এক ইতিহাস। অনেকে এটাকে সবজি মনে করে। কিন্তু বিজ্ঞান এটাকে ফলই বলে। সে অন্য গল্প। চলো টমেটোর নামের পেছনের দারুণ গল্পটা জানি।
টমেটোর জন্ম দক্ষিণ আমেরিকায়। আজকের পেরু, ইকুয়েডর আর আশপাশের অঞ্চলে বহু হাজার বছর আগে বুনো টমেটো জন্মাত। তবে টমেটোকে চাষের মাধ্যমে খাবার হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে অ্যাজটেক সভ্যতা, যারা বর্তমান মেক্সিকো অঞ্চলে বাস করত। আর এখানেই শুরু নামকরণের গল্প।
শুরুতে ছিল টোমাটল
অ্যাজটেকরা টমেটোকে বলত টোমাটল। তাদের ভাষার নাম ছিল নাহুয়াতল। এই ‘টোমাটল’ শব্দের মানে ছিল ফোলা বা রসালো ফলজাতীয় কিছু। অনেক গবেষক বলেন, সেখান থেকেই ‘টমেটো’ শব্দের জন্ম। ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা আমেরিকায় এসে টমেটো দেখে মুগ্ধ হয়। তারা টমেটো ইউরোপে নিয়ে যায়। কিন্তু ‘টোমাটল’ শব্দটি স্প্যানিশদের মুখে বদলে হয়ে যায় টোমাতে। এখানেই প্রথম বড় রূপান্তর।
তারপর এই ‘টোমাতে’ ইতালিতে গিয়ে আরেক মজার মোড় নেয়। ইতালীয়রা টমেটো দেখে ভাবল, এ তো যেন সোনালি আপেল! কারণ, শুরুতে ইউরোপে যে টমেটো যায়, তার অনেকগুলোই ছিল হলুদ রঙের। তাই তারা নাম দিল পোমো দোরো, মানে ‘সোনার আপেল’। এখান থেকেই পরে তৈরি হয় বিখ্যাত ইতালীয় টমেটোভিত্তিক রান্নার ধারা—পাস্তা সস থেকে পিৎজা পর্যন্ত।
তবে শেষ পর্যন্ত ‘টোমাতে’ ঘুরে হয়ে গেল টমেটো। আর সেই টমেটোই বাংলায় এসেছে টমেটো হয়ে। মানে দাঁড়াল, টমেটোর নাম এসেছে অনেকটা এমন পথে—টোমাটল, টোমাতে, টমেটো। একটা নাম, তিন মহাদেশ, কয়েক ভাষা!
টমেটো যখন ভয়ের!
টমেটো নিয়ে একসময় মানুষ খুব ভয়ও পেত। ইউরোপে টমেটো যখন প্রথম পৌঁছায়, অনেকে ভাবত এটা বিষাক্ত। কারণ, এটি নাইটশেড পরিবারের উদ্ভিদ—যে পরিবারে বিষাক্ত কিছু উদ্ভিদও আছে। কেউ কেউ টমেটোকে ‘বিষ আপেল’-ও বলত। মজার বিষয়, টমেটো নয়, অনেক সময় সমস্যা হতো অন্য জায়গায়। ধনী ইউরোপীয়রা সিসাযুক্ত ধাতব প্লেটে খাবার খেত। টমেটোর অম্ল সেই সিসা গলিয়ে খাবারে মিশিয়ে দিত, আর মানুষ অসুস্থ হতো। দোষ যেত টমেটোর ঘাড়ে! পরে ধীরে ধীরে মানুষ বুঝল, টমেটো তো দারুণ খাবার।
আমাদের বিলাতি বেগুন
বাংলায় ‘টমেটো’ নামটি এসেছে এই দীর্ঘ ভাষাভ্রমণের পথ ধরে। তবে আমাদের দেশে অনেক জায়গায় একে ‘বিলাতি বেগুন’-ও বলা হতো। ‘বিলাতি’ মানে বিদেশি। কারণ, এটি দেশি উদ্ভিদ ছিল না। এই নাম আজও কিছু অঞ্চলে শোনা যায়।
টমেটো নিয়ে মামলা
তবে নামের সঙ্গে টমেটোকে ঘিরে আরও এক বিখ্যাত বিতর্ক আছে—এটা ফল, না সবজি? বিজ্ঞানের হিসেবে এটি ফল। কারণ, ফুল থেকে জন্মায়, ভেতরে বীজ আছে। কিন্তু রান্নাঘরে? ওটা সবজি। এই নিয়ে একসময় যুক্তরাষ্ট্রে আদালত পর্যন্ত মামলা গড়ায়। ১৮৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, করের হিসাবে টমেটো সবজি! কারণ, মানুষ এটাকে খাবারে সবজির মতো ব্যবহার করে। ভাবা যায়? একটা টমেটোকে নিয়ে আদালতে মামলা!
আজ পৃথিবীর প্রায় সব রান্নায় টমেটো আছে। ভারতের কারি, ইতালির পাস্তা, বাংলাদেশের ভর্তা—সবখানেই। কিন্তু এই পরিচিত টমেটোর নামের ভেতরে লুকিয়ে আছে ভাষার যাত্রা, ইতিহাসের পালাবদল, আর মানুষের কৌতূহল। ভাবো তো, আজ তুমি বাজারে গিয়ে ‘টমেটো’ বলছ—কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে এখনো বেঁচে আছে অ্যাজটেকদের ‘টোমাটল’। একটা ছোট লাল ফল, অথচ নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের গল্প। এ কারণেই খাবারের নামগুলোও শুধু নাম নয়, তারা ইতিহাসের দরজা। আর টমেটো? সে তো রীতিমতো এক ভ্রমণপিপাসু নাম।
তথ্যসূত্র: দ্য কেটল হুইসল



