রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের মূল সড়কের পাশের ফুটপাতে ভোরের চিত্রটা একটু ভিন্ন। যখন শহরের অনেক বাসিন্দার ঘুম ভাঙে না, তখন এখানে জমে ওঠে একটি ভিন্ন রকমের ভিড়। সেই ভিড়ের মানুষের দিকে তাকালে চোখে পড়ে কারও হাতে কোদাল-বালতি, কাঁধে গামছা, কারও ব্যাগে রাখা নানা যন্ত্রপাতি। তাঁদের অপেক্ষা একটাই—কেউ তাঁদের ‘কিনতে’ আসবেন। এটি সেসব ‘মানুষের হাট’, যাঁরা নিজের শ্রম বিক্রি করতে এখানে আসেন।
দশকের পর দশক ধরে টিকে থাকা শ্রমবাজার
মিরপুর ১ গোলচত্বর থেকে সামান্য দূরে, রাস্তার পাশের এই শ্রমবাজার দশকের পর দশক ধরে টিকে আছে। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ এখানে ভিড় জমান। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, টাইলস মিস্ত্রি ও তাঁদের সহযোগী এবং নানা কাজের দিনমজুর।
সুলতানের গল্প: ৭০ বছর বয়সেও কাজের আশায়
ফুটপাতের একটা অংশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন মানুষ। তাঁদের একজন মো. সুলতান, বয়স ৭০ পেরিয়েছে, গায়ে ধুলামাখা শার্টে ময়লার আস্তরণ জমেছে, নেই কয়েকটি বোতামও; পরনে লুঙ্গি আর কোমরে গামছা বাঁধা। সঙ্গে থাকা একটি পুরোনো ব্যাগে আরও কয়েকটি জামাকাপড়, একটি চশমার বাক্সে রাখা আছে জাতীয় পরিচয়পত্র।
মো. সুলতান প্রায় ৩০ বছর ধরে রাজমিস্ত্রির ‘জোগালি’ হিসেবে কাজ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়ায়। এর আগে তিনি বেবিট্যাক্সি চালাতেন। সুলতানের একমাত্র ছেলে বয়োজ্যেষ্ঠ মা–বাবার কোনো দেখাশোনা না করায় বয়সের ভারে নুইয়ে পড়লেও খাবার জোটাতে তাঁকে প্রতিদিন কাজের খোঁজে আসতে হয়। সুলতানের স্ত্রী থাকেন গ্রামে। মো. সুলতান কাজ পেলে তাঁর স্ত্রীর জন্য খাবার ও ওষুধের টাকা পাঠান। তিনি বলেন, ‘দোকানে গিয়া কহনো ২০০ টেকা, কহনো ৩০০ টেকা পাঠাই। আমার তো মোবাইল নাই, দোকানে গেলে পাঠাইয়া দেয়।’
মো. সুলতানের ঢাকায় কোনো থাকার স্থান নেই। তিনি জানালেন, রাতে মিরপুর ১–এর আশপাশের সড়ক কিংবা ফুটপাতই তাঁর থাকার জায়গা। কাজ পেলে খাবার কিনতে পারেন, কাজ না পেলে উপোস থাকতে হয়।
মো. সুলতান বলেন, ‘ঈদের পর থেইকাই কাম নাই। গত তিন দিন ধইরা কোনো কাম পাই নাই। কাল বিকাল থেইকা কিচ্ছু খাই নাই। পকেট একেবারে খালি, একডা ট্যাহাও নাই।’ বর্তমান বাজারে কাজ কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এক দিন কাম পাই, পাঁচ দিন পাই না। এইভাবে কেমনে চলমু কন? আর চলতে পারতাছি না বাবা।’ বয়স বেশি হওয়ায় অনেকে তাঁকে কাজে নিতে চায় না কিংবা নিলেও কম টাকা দিতে চায় বলেও জানান তিনি।
নারী শ্রমিকদের সংগ্রাম
শ্রম বিক্রির এই হাটে পুরুষদের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে আছেন নারী শ্রমজীবীরা। তাঁরা কাজ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন মূল সড়কের ফুটপাত থেকে কিছুটা পেছনে ভবনের সিঁড়িতে বসে। তাঁদের একজন ৪২ বছর বয়সী পারুল আক্তার। তিনি টাইলসের ‘পুটিং’ লাগানোর কাজ করেন। কাজ পেলে দিনে ৪০০ টাকা জোটে তাঁর। প্রায় ১৫ বছর ধরে এই কাজ করছেন তিনি। পাশের উত্তর বিশিল এলাকায় একটি টিনশেড বাসায় স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়ে, মাদ্রাসাপড়ুয়া এক ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে তাঁর সংসার। স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় কাজে নামতে হয়েছে পারুলকে।
পারুল আক্তার বলেন, ‘স্বামী অসুস্থ, হেই লাইগা কাম করতে অয়। অনেক কষ্ট অয়, তয় কষ্ট কইরাই চলতাছি। কষ্টের মইদ্দেই দিন যাইতাছে। আমাগো মাইয়াগো পুরুষগোর মতো কাম দেয় না, আর টেকাও কম দিতে চায়।’ একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানান একই কাজ করা আরেক নারী রিনা বেগম।
রিনা বেগমের জীবনযুদ্ধ
২০ বছর আগে স্বামী মারা গেছে ৪৫ বছর বয়সী রিনা বেগমের। এরপর রাজধানীতে কাজের জন্য আসেন তিনি। ময়মনসিংহের মোহনগঞ্জ উপজেলার এই নারী দশম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে ও তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ মাকে নিয়ে মিরপুরের উত্তর বিশিল এলাকায় থাকেন। তাঁর মা মানুষের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ করে মাসে চার হাজার টাকার মতো পান। যে বাসায় রিনা বেগমরা থাকেন, তার ভাড়া সাত হাজার টাকা। আর মাসে শেষে তাঁর আয় ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার। নিজের ও মায়ের আয়ে কোনোরকমে দিনাতিপাত করছেন জানিয়ে রিনা বেগম বলেন, ‘কাম না করলে তো খাওন জুটব না। কেমনে চলমু?’
তিন দিন ধরে কাজ নেই সিরাজের
সকাল আটটার পর একজন ঠিকাদার এলেন। চারজন রাজমিস্ত্রি দরকার। মুহূর্তেই তাঁকে ঘিরে ধরলেন ১০–১২ জন। দরাদরি চলল কিছুক্ষণ। শেষ পর্যন্ত চারজন বেছে নিয়ে চলে গেলেন তিনি। বাকিরা আবার ফিরে গেলেন ফুটপাতে। মুখে কোনো কথা নেই, শুধু দৃষ্টিটা শূন্যে।
মিরপুর ১–এর এই শ্রমহাটে তিন দিন ধরে কোনো কাজ পাননি ৩৯ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি মো. সিরাজ। সকাল সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে গতকালও কাজ পাননি তিনি। তিনি বলেন, ‘আগে সপ্তাহে এক দিনও খালি থাকতাম না। এখন উল্টা—কাজ থাকে না।’
গফ্ফার হোসেন: ঋণের বোঝা আর ডাইল-ডুইল খেয়ে দিন কাটে
মো. সিরাজের পাশে বসে ছিলেন ৬০ বছর বয়সী গফ্ফার হোসেন। পাইপ ফিটিংসের কাজ করেন তিনি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া গফ্ফার হোসেন প্রায় বছর দশেক আগে বরগুনার বেতাগী থেকে ঢাকায় আসেন। আগে গাছ কাটার কাজ ও খেতখামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখন স্ত্রীকে নিয়ে গুদারাঘাটে একটি টিনশেড বাসায় থাকেন। সংসার চালাতে গিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ হয়েছে তাঁর। সকাল থেকে কাজের অপেক্ষায় বসে ছিলেন।
গফ্ফার হোসেন বলেন, সকাল ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন, এরপর কাজ না পেলে ফিরে যাবেন। সব মিলিয়ে কেমন চলছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনোরকমে চলি। ওই ডাইল-ডুইল খাইয়া থাকি আরকি।’
ঘড়িতে সকাল ১০টা বাজতে বাজতে অনেকে উঠে দাঁড়ালেন। এরপর আর সাধারণত কাজ মেলে না, সকালে যাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছে, এর মধ্যে তাঁদের কয়েকজনকেও দেখা গেল। যাঁরা কাজ পাননি, তাঁরা ফিরে যাবেন—কেউ মেসে, কেউ ভাড়া বাসায়। পেটে হয়তো এক বেলা খাওয়া হবে, হয়তো হবে না। গফ্ফার হোসেন উঠতে উঠতে বললেন, ‘কাইল আবার আসুম। দেখি কপালে কী আছে।’



