আদিমের যাত্রা: প্রকৃতিজাত পণ্য ঘরে ঘরে পৌঁছানোর স্বপ্ন
আদিমের যাত্রা: প্রকৃতিজাত পণ্য ঘরে ঘরে পৌঁছানোর স্বপ্ন

দেশীয় প্রকৃতিজাত উপকরণ দিয়ে তৈরি পণ্য যেন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছায়, এই ভাবনা থেকেই 'আদিম'-এর যাত্রা শুরু। এই উদ্যোগের নেপথ্যে থাকা সুমন ইউসুফ জানালেন, মাটি, ফলের বীজ, তুলার তন্তু, কাঠের গুঁড়া—এসব দিয়েই তৈরি হচ্ছে নানা রকম গয়না ও শিল্পকর্ম।

কেন 'আদিম' নাম?

সুমন ইউসুফ বলেন, 'মাটি থেকে শুরু করে এ অঞ্চলে আমাদের বিকাশের যেসব উপকরণ ছিল, সেগুলোকেই আদিম নতুন আঙ্গিকে সামনে নিয়ে আসতে চায়। আমাদের এই ভূখণ্ডে যা কিছু সহজলভ্য ও রোজকার, যেমন ফলের বীজ ও খোসা, তুলার তন্তু, কাঠের গুঁড়া ও টুকরা, মাটি ইত্যাদি ঘিরে আমাদের যে ভাবনা, দর্শন ও স্মৃতিকাতরতা, সেগুলোকেই আধুনিক সময়ের উপযোগী করে উপস্থাপনের একটা প্ল্যাটফর্ম হলো আদিম। শিকড়ের কাছে ফিরতে চাওয়ার তাড়না থেকেই এই নাম।'

কী কী উপাদান ব্যবহার করে আদিম?

আদিমে গাছ থেকে পাওয়া উপাদান, যেমন শুকনা ফুল, ফলের বীজ, খোসা, তালপাতা, বিভিন্ন ঘরোয়া জিনিস, মাটির টেপা পুতুল ও গয়না, কাপড়ের পুতুল, সুতা দিয়ে তৈরি গয়নাসহ ঘর সাজানোর বিভিন্ন জিনিস, ফেলে দেওয়া নানাবিধ বস্তু, বিভিন্ন দেশীয় ধাতু ও ধাতব উপকরণকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সুমন ইউসুফ বলেন, 'মাটি, সুতা, ফেলে দেওয়া অকাজের জিনিস কুড়িয়ে আনি। সেসব জুড়ে, সাজিয়ে, গুছিয়ে কখনো গয়না হয়, কখনো কোনো আর্টপিসও হয়। আসলে আমরা কিছুই করি না। উপকরণগুলোই মিলেমিশে একেক সময় একেকটা রূপ ধারণ করে।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি আরও বলেন, 'আমরা চাই, আমাদের দেশীয় প্রকৃতিজাত উপকরণগুলো যতটা সম্ভব মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাক, সবার ভেতর ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠুক। যেহেতু মানুষ খুব দ্রুত এবং সব সময় গয়না ধারণ করে, সেই সুবাদেই আসলে আমাদের গয়নাকে বেছে নেওয়া। গয়নার পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন আর্টপিস আর হোম ডেকোর নিয়েও কাজ করছি। মাটি আর কাপড়ের তৈরি পুতুল আমাদের অন্যতম গৃহসজ্জাসামগ্রী।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পণ্যের মূল্য নির্ধারণ

বিশেষ ধরনের আর্টপিসগুলো নির্মাণ করতে যে পরিমাণ কাঁচামাল, নির্মাণদক্ষতা, সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়, সেগুলোর মূল্যও সেভাবে নির্ধারিত হয়।

কবে থেকে কাজ শুরু?

২০২৩ সাল থেকে মূলত কাজ শুরু। প্রথমে বিসিক থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন সুমন। এই কাজ নিয়েই সামনে এগোতে চেয়েছিলেন। প্রথম দুই বছর একা একা চুপচাপ কাজ করে তেমন সাড়া বা প্রচার না পেয়ে পরে নিজেই প্রচারের উদ্যোগ নেন। ফেসবুকের পেজের জন্য ছবি তোলা, ভিডিও করা, এডিট করা, পোস্ট করা, পেজ চালানো, মেসেজের উত্তর দেওয়া—মানে পুরো যোগাযোগটা তিনি নিজেই করেন।

কেন আবার নতুন করে সামনে আনতে হচ্ছে?

আগের সময়ের চেয়ে বর্তমানের সময়টা ভিন্ন। ওই সময় মাটির জিনিসের যে আধিপত্য ছিল, সেখান থেকে বিদেশি ধাতু, বিদেশি রত্ন, কাচ, চাঁচ আর সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিকের আগ্রাসন হয়েছে। এসব নিয়ে কাজ করা সহজ। পরিশ্রম কম, বিনিয়োগ কম, সময়ও কম লাগে। যেখানে মাটির কাজে অনেক খাটনি, সময়ও বেশি লাগে। অনেকেই তাঁতীবাজার বা সাভার থেকে সস্তায় ধাতব পণ্য কিনে স্থানীয় বড় বড় মার্কেটে বিক্রি করেন। অন্যদিকে মাটি, সুতা, কাপড়ের শ্রমিক বা শিল্পীদের কাঁচামাল সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে পণ্য নির্মাণসহ বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো যুদ্ধটা করতে হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। এখন সুমনের মতো যাঁরা চাচ্ছেন, সেই অতীত ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে, তাঁদের নতুন করে নতুন যুগের মানুষের রুচি, চাওয়া অনুযায়ী মাটিকে নতুন রূপে, নতুন ধরনে সামনে নিয়ে আসতে হচ্ছে।

অনুপ্রেরণা কোথা থেকে?

বেশ কিছু দেশ, জনপদ, লোকালয় ঘুরে এসব ভাবনার সৃষ্টি। গয়নার ব্যাপারে মূল প্রেরণাটা আসে ব্রাজিলের আমাজন ইত্যাদি এলাকার স্থানীয় গয়না থেকে। ওসব জায়গায় ধাতু, প্লাস্টিকসহ কৃত্রিম উপকরণের কোনো ব্যবহার নেই। সবকিছুই তারা প্রকৃতি থেকে আহরণ করে। কুয়েতে তিনি সেসব দেখেছেন। পরে শান্তিনিকেতনে গিয়ে বোলপুরের স্থানীয় শিল্পকর্ম দেখেছেন, যেগুলো ওই জায়গা ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। গাছের ফুল, ফল, খোসা, বীজ, বাকল ইত্যাদি ব্যবহার করার ভাবনাটা সেখান থেকেই এসেছে। আমাদের দেশেও পাহাড়ি ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে দেখে, শিখে বানানোর চেষ্টা করেন। তিনি শুরু করেছিলেন পিচ ফলের বীজ দিয়ে। পরে বঁইচির বীজ, কলকি ফুলের বীজ, রঞ্জনা ইত্যাদি দিয়ে কাজ শুরু করেন।

বঁইচি কিন্তু এখন বিলুপ্তপ্রায়। পাওয়াই যায় না। এমন একটা দুর্লভ জিনিস জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে গয়নায় রূপ দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এমনও হয়েছে যে ঢাকায় কেউ তাঁর কাছ থেকে বঁইচির বীজ নিয়ে ছাদবাগানে গাছ লাগিয়ে দেন। এসব ঘটনাই আদিমের অনুপ্রেরণার উৎস।

পণ্যের বিশেষত্ব

এগুলো সম্পূর্ণ হাতের কাজ, প্রতিটি কাজই অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। কাজেই একটি পণ্যের পুনরাবৃত্তি তারা করতে চান না। কোনো গয়নার একটা সেটই হয়তো বানানো হয়েছে। কেউ সেটা কিনল, ব্যবহার করল, কাউকে দেখাল বা অন্যরা দেখল। তখন আরেকজনও সেই একই গয়না দাবি করে বসেন। তাদের জানান, আবদার করেন। কখনো কখনো অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করে দেন। এমনও হয়েছে যে একটা গয়নার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করেছেন কেউ কেউ।

ফরমাশ দেওয়ার মাধ্যম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুকে যে পেজ আছে, সেটাতেই মানুষ যোগাযোগ করেন। কেউ কেউ সামনাসামনি দেখা হলে বলেন। ফোনও আসে প্রচুর।

আদিমের জনপ্রিয়তার কারণ

প্রতিটি জিনিসকে শিল্পকর্ম হিসেবেই তৈরি করা হয়। প্রতিটি গয়না, পুতুল, শোপিসের পেছনে কিছু গল্প থাকে, হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি থাকে, আমাদের মা-ঠাকুরমা, বাবা-কাকাদের জীবনযাপনের নিদর্শন থাকে, আমাদের শৈশবের গল্প থাকে। যেমন নকশিকাঁথা সেলাইরত স্ত্রী, মাথাল দেওয়া কৃষক, সন্তান কোলে নিয়ে মা, কলস কাঁখে গৃহবধূ, মাছ ধরা জেলে, তাঁতবোনা তাঁতি, চাকা ঘূর্ণনরত কুমার ইত্যাদি অনেক রকম ফিগার। এগুলো যখন মাটি, সুতার মতো মৌলিক উপাদানে তৈরি হয়, তখন গল্পগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। এগুলো শুধু পুতুল নয়, এগুলো আমাদের অতীতের দিকে টানে, শিকড়ের কাছে নিয়ে যায়। পুতুলগুলো দেখে শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়। গ্রামের কথা মনে পড়ে। বেড়ে ওঠার স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মানুষ হয়তো এসব দৃশ্যকে আপন করে নিতে চায়। ছোট্ট একটুকরা শৈশবকে নিজের ঘরে নিয়ে রাখতে চায়। এ জন্যই হয়তো আদিমকে মানুষ এত পছন্দ করে। আর আমরাও চাই, গল্পগুলো ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক। এখনকার শিশুরা তাদের পূর্বপুরুষ, আমাদের ভূখণ্ড ও জলবায়ুকে খুব কাছ থেকে দেখুক, জানুক।

পণ্যের দাম

আদিম দুই ক্যাটাগরিতে কাজ করে: রেগুলার হোম ডেকোর আর ইউনিক আর্টপিস। রেগুলার জিনিসগুলোর দাম বেশি না, কমবেশি ৫০০ টাকা থেকে শুরু। কিন্তু বিশেষ ধরনের আর্টপিসগুলোর দাম বেশি আর সেটা হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, এসব কাজ চাইলেই বা চেষ্টা করলেও করা যায় না। এগুলো কঠিন। যেহেতু সব উপকরণই প্রকৃতি থেকে আহরণ করতে হয় এবং সেটা সংগ্রহই। কুড়িয়ে নেওয়া। কোনো কিছুই গাছ থেকে ছিঁড়ে আনা হয় না। কোনো দুর্লভ গাছের বাকল বা বীজ বা নির্দিষ্ট কোনো এলাকা থেকে সংগ্রহ করে আনা দুর্লভ মাটি তো সব সময় সহজলভ্য নয়। কাজেই সেগুলো দিয়ে তৈরি করা গয়না বা শিল্পকর্ম খুবই বিশেষ হয়। সেটা হয়তো মাত্র একটা বা একবারই বানানো গেল। পুনরাবৃত্তি হলো না। কেউ চাইলেও দশটা দিতে পারবেন না। হয়তো অনেক কষ্ট করে আর মাত্র একটা বানানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। যেহেতু কোনো ছাঁচ নেই, কোনো মেশিন নেই। সবকিছু নিজের হাতে করতে হয়। মাটির জিনিস যদিও ছাঁচ বা ফ্রেমের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তুলা, তন্তু, বীজ, খোসা ইত্যাদি জিনিসের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে দাম ওইভাবে সমন্বয় করতে হয়। না হলে সময়, শ্রম, মেধার কোনো মূল্যই থাকে না। আদিমের সবচেয়ে দামি পণ্য চরকাবুড়ি, কাঠ, কাপড়, সুতা ইত্যাদি দিয়ে তৈরি, দাম ১৫ হাজার টাকা। আরও আছে বায়োস্কোপ, দাম ১০ হাজার।

সুতা বা কাপড়ের পুতুলের মূল্য

কাপড় বা সুতার কাজেও তো কোনো ছাঁচ থাকে না। প্রতিটি আইটেম আলাদা। সবই একদম হাতে, আঙুলে বানানো হয়। প্রতিটি পুতুলের কাপড়, পরিধেয় পোশাক, গয়না—এগুলোও হাতে বানানো হয়। এসব পুতুলকে যে পোশাক পরানো হয়, যেমন শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা–এগুলো কিন্তু অন্য কাপড় ছিঁড়ে তার খণ্ডাংশ দিয়ে বানানো হয় না। গ্রামীণ নারী চরিত্রের পুতুলের শাড়িটা তাঁতে বানানো। ছোট ছোট শাড়ি তাঁতির কাছ থেকে বানিয়ে নেওয়া হয়। বড় তাঁতে ছোট্ট শাড়ি বানানো খুব কষ্ট। আর সব কাজ যেহেতু সুমন নিজেই করেন, তাই একটা জিনিস বানাতে অনেক সময় লাগে। একই আইটেম একসঙ্গে অনেকগুলো বানাতে পারেন না। তেমনটা করতে পারলে হয়তো দামটা আরও কমিয়ে ফেলা যেত। তিনি চেষ্টাও করছেন। কাজটা আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা তাঁর আছে।