চট্টগ্রামে স্বাধীনতা বইমেলার সমাপ্তি: গুণীজনদের সম্মাননা ও প্রকাশকদের হতাশা
চট্টগ্রামে ১৯ দিনব্যাপী স্বাধীনতা বইমেলা আজ শনিবার সমাপ্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ও সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সহায়তায় চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম-সংলগ্ন জিমনেসিয়াম মাঠে ৩১ মার্চ শুরু হওয়া এই মেলায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১৩০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। শেষ দিনে সন্ধ্যায় একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মেলার সমাপনী ঘটে, যেখানে ১৩ জন ব্যক্তি ও ৩টি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়।
সম্মাননা প্রাপ্তদের তালিকা
মূল মঞ্চে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন ও অন্যান্য অতিথিরা গুণীজন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। সম্মাননা প্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন:
- স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান: প্রয়াত রাজনীতিবিদ আবদুল্লাহ আল নোমান (মরণোত্তর)
- মুক্তিযুদ্ধে অবদান: মো. একরামুল করিম
- শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান: চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নূর আহমদ চেয়ারম্যান (মরণোত্তর)
- চিকিৎসাক্ষেত্রে অবদান: এম এ ফয়েজ
- সাংবাদিকতায় অবদান: দৈনিক পূর্বকোণ-এর সম্পাদক ডা. ম রমিজ উদ্দিন চৌধুরী
- ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদান: বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান
- সমাজসেবায় অবদান: বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
- স্বাস্থ্যসেবায় অবদান: চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল
- সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অবদান: জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)
- সংগীতে অবদান: শিল্পী আবদুল মান্নান রানা
- চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অবদান: শিল্পী বুলবুল আকতার
এছাড়াও সাহিত্যে অবদানের জন্য পাঁচজনকে সম্মাননা পদক দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে রয়েছেন গীতিকবিতায় ড. আবদুল্লাহ আল মামুন, শিশুসাহিত্যে সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, প্রবন্ধ ও গবেষণায় হারুন রশীদ, কবিতায় শাহিদ হাসান এবং কথাসাহিত্যে জাহেদ মোতালেব।
গুণীজনদের প্রতিক্রিয়া
দৈনিক পূর্বকোণ-এর সম্পাদক ডা. ম রমিজ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, "এই সম্মাননা অনেক বড় সম্মানের। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে চট্টগ্রামের প্রান্তিক ও বঞ্চিত মানুষের কথা তুলে ধরেছেন পূর্বকোণ–এ। তবে কোনো ধরনের সম্মাননা বা পদকের জন্য তা করেননি। আজ যে স্বীকৃতি পেয়েছেন, তা ভবিষ্যতে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।"
গীতিকবি ড. আবদুল্লাহ আল মামুন, যিনি ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গানের জন্য বিখ্যাত, তিনি বলেন, "জীবনে অনেক পদক ও স্বীকৃতি পেয়েছি। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আজকের যে সম্মাননা পেয়েছি, তার স্বীকৃতি আমার জন্য অন্য রকম অনুভূতি। কেননা এই শহরের সন্তান হিসেবে হোমটাউনেই স্বীকৃতি পেয়েছি। তা নেওয়ার জন্য সিডনি থেকে অস্ট্রেলিয়া থেকে ছুটে এসেছি।"
মেলার ব্যবসায়িক দিক ও প্রকাশকদের হতাশা
মেলার শেষ দিন বিকেলের পর দর্শনার্থীর ভিড় কিছুটা বাড়লেও তা প্রকাশকদের প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। এবারের বই বেচাবিক্রি নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রকাশকেরা। তাঁদের মতে, বইমেলার সময় পাল্টে যাওয়ায় পাঠকের উপস্থিতি ও বিক্রি—দুই দিকেই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রতিবছর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত একুশের বইমেলা এবার জাতীয় নির্বাচন ও পবিত্র রমজানের কারণে মার্চ মাসে আয়োজন করা হয়, যা পাঠকদের কাছে স্বাভাবিক সময় থেকে ভিন্ন মনে হয়েছে।
প্রথমা প্রকাশনের কর্মী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, "এবারের মেলা নিয়ে তাঁরা খুব হতাশ। সব সময় মেলার শেষ দিকে ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিপুল পাঠকের উপস্থিতি থাকে। এবার তেমন কিছু ছিল না। শেষের দিনগুলো নিয়ে আশা ছিল, কিন্তু তা–ও হলো না।"
কথাপ্রকাশের নির্বাহী (বিপণন) মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, "এবারের মেলায় দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল কম। তবে একটা ভালো দিক ছিল, যাঁরা প্রকৃত পাঠক, তাঁদের উপস্থিতি সন্তোষজনক। যাঁরা এসেছেন, তাঁরা সবাই কমবেশি বই কিনেছেন। মেলায় শুধু ঘুরতে আসেন এ রকম লোকের সংখ্যা কম ছিল।"
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দাবি অনুযায়ী, এবার পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। তবে প্রকাশকদের মতে, আয়োজনজুড়েই বিক্রি মন্থর ছিল এবং ছোট ও স্থানীয় প্রকাশকেরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। প্রকাশকরা আগামী বছর থেকে আবার ফেব্রুয়ারিতে একুশের বইমেলা আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন, যার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মেয়র শাহাদাত হোসেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তব্য
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, "ইতিহাসে যার যা সম্মান তা দিতে হবে। ইতিহাস পাল্টানো ঠিক হবে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জিয়াউর রহমানের নাম আপনি বাদ দিতে পারবেন না। তাঁকে ওই জায়গায় আপনাকে সম্মান দিতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর জায়গায় সম্মান দিতে হবে। আমি মনে করি এই জায়গায় কোনো ধরনের ইতিহাস পাল্টানো কখনো সম্ভব নয়।"
অতিথি বক্তা মুক্তিযুদ্ধ গবেষক মাহফুজুর রহমান বলেন, "আজ চট্টগ্রামবাসীর সামনে বিপদ হাজির হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানকে নগরের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউট করার জন্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু হেরিটেজ হিসেবে খ্যাত সিআরবিতে এ ধরনের কোনো স্থাপনা করতে দেওয়া হবে না। আইনেও নিষেধ রয়েছে। চট্টগ্রামবাসী আন্দোলনে নামবে, মেয়র এ আন্দোলনে সামনে থাকবেন।"
মেলায় অংশ নেওয়া দর্শনার্থীদের কেউ কেউ বলেছেন, ভিড় কম থাকায় স্বস্তিতে স্টল ঘোরা গেছে এবং পছন্দমতো বই দেখার সুযোগ ছিল। তবে সামগ্রিকভাবে এবারের মেলা ব্যবসায়িক দিক থেকে হতাশাজনক রূপ নিয়েছে বলে প্রকাশকরা মত প্রকাশ করেছেন।



