কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারে বাংলাদেশি লেখক আনমনা মনীষিতা, সাক্ষাৎকারে উঠে এলো তার সাহিত্যজীবনের গল্প
কমনওয়েলথ পুরস্কারে আনমনা মনীষিতা, সাক্ষাৎকারে তার সাহিত্যজীবন

কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারে বাংলাদেশি লেখক আনমনা মনীষিতার সাফল্য

কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কার ২০২৬-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশি লেখক আনমনা মনীষিতা। তিনি বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত এবং ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডে সম্পাদকীয় সহকারীর দায়িত্ব পালন করছেন। আনমনা মনীষিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ও ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন হেমায়েত উল্লাহ ইমন, যেখানে লেখক তার সাহিত্যজীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন।

লেখালেখির শুরু ও প্রভাব

হেমায়েত উল্লাহ ইমন: আপনার লেখালেখির শুরুটা কীভাবে?

আনমনা মনীষিতা: ছোটোবেলা থেকেই গল্প শুনতে ভালোবাসতাম। পরে যখন দেখলাম যে সবাই ব্যস্ত থাকলেও গল্পের সন্ধান পাওয়া যায় বই থেকে, তখন থেকে পড়া শুরু করলাম। যখন গল্প শুনতাম, তখন আমি গল্প বলতাম সুযোগ পেলেই। তো যখন পড়া শুরু করলাম, তখন লিখতাম। তবে সেগুলো কাউকে দেখাতাম না খুব একটা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রশ্ন: আপনি সাধারণত কোন ধরনের লেখা পড়েন? আপনার পছন্দের দু'একজন লেখকের নাম বলুন?

উত্তর: আমি আসলে সবই পড়ি। যদি ভাষা বোধগম্য হয়, আর আমার সামনে থাকে, পড়ি। পছন্দের অনেকেই আছেন—এলেনা ফেরান্তে, ইতালো কালভিনো, কমলকুমার মজুমদার, ইসাবেল আয়েন্দে, জেন অস্টেন, তাইয়েব সালিহ, ক্লারিস লিসপেক্টর, লিওনারা কারিংটন...আমি আর না বলি।

'এ ম্যাসকুলিন ফেস্ট' গল্পের পেছনের গল্প

প্রশ্ন: ‘এ ম্যাসকুলিন ফেস্ট’ গল্পটির লেখার পেছনের গল্পটি কী?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উত্তর: আমি যখন ছোট, তখন আমাদের বাসায় প্রায়ই বিকেলে আমরা চা খেতে খেতে গল্প করতাম। অনেক মানুষের মধ্যে কথা কম বলতাম আমি, আর তাই, সেই আড্ডাগুলোয় আমি শুনতামই বেশি। যার কথা সবথেকে বেশি মন দিয়ে শুনতাম, সে হচ্ছে আমার দাদুমনি। দাদুমনির একটা বই আছে—আত্মজীবনীমূলক—সেটা আমি ছোটোবেলায় প্রায় ৭ বার পড়েছি—তো আমার দাদুমনির জীবন থেকে আমি বেশ কিছু উপাদান নিয়েছি।

প্রশ্ন: গল্পটির বিষয়বস্তু ও কেন্দ্রীয় ভাবনা কী?

উত্তর: ১৯৫০-এর দশকের প্রেক্ষাপটে লেখা। একজন বাঙালি মুসলিম নারীর কাহিনি। দাদুমনির জীবনের কাহিনির অনেক উপাদানই ধার নিয়েছি আমি এই গল্পে। ১৯৫০ সালে একজন মেয়ের জীবন কেমন ছিলো, কি ধরনের আনন্দ তার ছিল বা কি ধরনের কষ্ট ছিল—সেইসবও আমি জেনেছি তার-ই কাছে…তার কথায়, বা তার লেখা আত্মজীবনীতে।

আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে গল্প উপস্থাপন

প্রশ্ন: বাংলা ভাষায় লেখা একটি গল্পকে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অর্থাৎ 'লোকাল' থেকে 'গ্লোবাল' করে তুলতে গিয়ে আপনার প্রধান ফোকাস ও চ্যালেঞ্জগুলো কী কী ছিল?

উত্তর: গল্পটা আসলে ইংরেজিতেই লেখা, তবে আমি খুব সচেতন ভাবেই 'চাচা/চাচি' এই সম্বোধন গুলোকে বদলাইনি, কারণ 'আংকেল/আন্টি' কখনো 'চাচা/চাচি'-এর অন্তরঙ্গতাকে ধারণ করতে পারে না বলেই আমার মনে হয়।

প্রশ্ন: আপনি নিজেও অনুবাদ ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিযোগিতায় অনুবাদের অংশটুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়। আপনার নিজের গল্পের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা কেমন?

উত্তর: অনুবাদের অংশটূকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তবে আমারটা অনূদিত হয়নি। ইংরেজিতেই লেখা।

প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও প্রেরণা

প্রশ্ন: প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার পরিকল্পনা কীভাবে এলো? এর পেছনে বিশেষ কোনো প্রেরণা বা কারণ ছিল কি?

উত্তর: পরিকল্পনা ঠিক ছিলো না। আমি প্রতিযোগিতার কথা মাথায় রেখে গল্পটা লিখিনি। গল্পটা আমি শেষ করেছিলাম কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি-এর ডেডলাইনের দুই/তিনদিন আগে। আমার এক বন্ধুকে দেখাতেই সে আমাকে বললো সাবমিট করতে, আর আমিও ভাবলাম যে করেই দেখি।

নারী লেখকদের ভূমিকা ও সাধারণ নারী চরিত্র

প্রশ্ন: বাংলাদেশে সাহিত্যচর্চায় নারী লেখকদের উপস্থিতি কম। একজন তরুণ নারী লেখক হিসেবে আপনার পাঠ ও অভিজ্ঞতায় নারী লেখকদের ভূমিকা কেমন? এবং সাধারণ নারীরা আপনার গল্পে কীভাবে হাজির হয়?

উত্তর: আচ্ছা, আমি আসলে এটা খেয়াল করেছি, তবে কখনো ভাবিনি। আমার মনে হয় যে, বাংলাদেশে (গোটা বিশ্বেই আসলে) লেখকদের অবস্থা খুব একটা সুবিধার না—মানে, লেখক হওয়াটা একটা সাইড-জবের মতন। লিখতে তো আসলে সময় লাগে, ছাপাতে টাকা লাগে, লেখা দেখানোর বা সেটা নিয়ে আলোচনা করার জায়গা লাগে। বাংলাদেশে কয়জনের সেই লাক্সারি আছে? আর নারীদের ক্ষেত্রে দেখলে, তাদের তো সংসারও করা লাগে—আমি আমার মা-কে দেখেছি। মা-ও লিখতে ভালোবাসেন। সময় কতটুকুই বা পান? আর আমি আসলে সাধারণ নারীদের নিয়েই লিখতে চাই। আমার এই গল্পটাও সাধারণ একজন নারীকে নিয়েই।

সাহিত্যে রুচি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

প্রশ্ন: আপনি ইংরেজি সাহিত্যে পড়েছেন, এখন পড়াচ্ছেন। আমরা দেখি যে, এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট একটা রুচি গড়ে ওঠে বা এধরনের প্রতিযোগিতাতেও দেখা যায়, একটা 'অলিখিত নির্দিষ্ট রুচি' বা প্যার্টানকেই সবসময়ই মূল্যায়ন করা হয়। আপনার মন্তব্য কী এবিষয়ে?

উত্তর: আমি একমত। এটা তো আসলে সব সময়েই হয়ে এসেছে। আমার মনে হয় যে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার ভিন্ন ভিন্ন ফর্ম বা লেখার ধরণ দরকার। তো, একটা নির্দিষ্ট রুচিকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখলে আমরা আসলে অনেকগুলো অভিজ্ঞতা, অনেকগুলো চিন্তা থেকে বঞ্চিত হই।

প্রশ্ন: ভবিষ্যতে আপনি কী ধরনের লেখা নিয়ে কাজ করতে চান?

উত্তর: আমি আসলে ঠিক জানিনা। তবে, যা বললাম, আমি সাধারণ কাহিনি গুলোই লিখতে চাই।

প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য পরামর্শ

প্রশ্ন: যারা এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী? প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?

উত্তর: যেহেতু আমি খুব একটা পরিকল্পনা করে লিখিনি, তাই আমার বিশেষ কোনো পরামর্শ দেওয়াও বোধহয় ঠিক হবে না। তবে, আমার মনে হয় কারোর যদি লিখতে ইচ্ছা করে, তার লেখা উচিত এবং লেখার পর লেখাটাকে কয়েকদিনের জন্য দূরে সরিয়ে রাখা উচিত। কয়েকদিন পর সেই লেখার কাছে আবার ফিরে যাওয়া উচিত, এবং প্রয়োজন মতো পরিবর্তন আনা উচিত। আর, যদি কেউ তার লেখাকে আরোও ভালো করতে চায়, তাহলে, আমার মতে, তার একজন সৎ পাঠক জোগাড় করা উচিত, যে তাকে তার লেখার ভালো দিকগুলোই কেবল নয়, বরং দুর্বল দিকগুলোর কথাও কোনো সংকোচ ছাড়াই জানাতে পারবে। চাঁছাছোলা সমালোচনা যেটাকে বলে, আরকি।