মধ্যযুগে বাংলার ইসলামি শিল্প-পরিবেশনা: ইউসুফ-জোলেখা থেকে পীরের গান
মধ্যযুগে বাংলার ইসলামি শিল্প-পরিবেশনার ইতিহাস

মধ্যযুগে বাংলার ইসলামি শিল্প-পরিবেশনার উদ্ভব ও বিবর্তন

১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় মুসলিম বিজয়ের পর প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে এই অঞ্চল সংঘাত ও অস্থিরতায় ভুগছিল। ফলে মুসলিম শাসকদের পক্ষে পরিবেশন শিল্পের ক্ষেত্রে কোনো জোরালো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের উত্থান এবং দিল্লির সালতানাত থেকে বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের ফলে ক্রমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসে। এই স্থিতিশীলতা কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারে সহায়ক হয়, যা বাংলাকে একটি সমৃদ্ধ ও প্রাচুর্যময় জনপদে পরিণত করে।

ইউসুফ-জোলেখা: সুফি দর্শনের গীত-নৃত্য পরিবেশনা

গৌড়ের তৎকালীন শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের অনুপ্রেরণায় শাহ মুহম্মদ সগির ইউসুফ-জোলেখা কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এই কাব্যের মূল বার্তা ছিল সহজ: আল্লাহ ও তাঁর আদেশের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই জোলেখার মতো মানবিক আবেগ ইউসুফের রূপক ধরে ঐশ্বরিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলনের পূর্ণতা পেতে পারে। পবিত্র কোরআনের সুরা ইউসুফের ওপর ভিত্তি করে রচিত এই আখ্যান মধ্যযুগের বাংলায় গোঁড়া ইসলামি ধারা এবং সুফি ধারার মধ্যেকার দ্বন্দ্বে মূলত সুফিবাদ–অভিমুখী ছিল।

সৈয়দ জামিল আহমেদের মতে, শাহ মুহম্মদ সগিরের ইউসুফ-জোলেখা আদৌ পরিবেশিত হতো কি না এবং হয়ে থাকলে তা কীভাবে হতো, তা বোঝার জন্য মূল পাঠ, বাংলা সফরকারি সমসাময়িক চীনা কূটনীতিকদের সাক্ষ্য এবং প্রাচীনতর গ্রন্থ গীতগোবিন্দ সংক্রান্ত প্রমাণাদি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সগিরের কাব্যটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর অনেকগুলো অধ্যায়ের শুরুতেই নির্দিষ্ট রাগ ও তালের উল্লেখ রয়েছে, যা নির্দেশ করে যে কাব্যটি বাদ্যযন্ত্রের সহযোগে গাওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গীতগোবিন্দের প্রভাব ও পরিবেশন শৈলী

সগিরের কাব্য রচনার কিছুকাল পরে বিখ্যাত চীনা কূটনীতিক মা হুয়ানের দেওয়া সাহিত্যিক বিবরণ থেকে জানা যায়, বাংলায় বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির মধ্যে গান ও নাচে দক্ষ একটি গোষ্ঠী ছিল, অভিজাতরা যাঁদের প্রায়ই ভোজসভা প্রাণবন্ত করতে আমন্ত্রণ জানাতেন। ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে রচিত গীতগোবিন্দ-এর সঙ্গে ইউসুফ-জোলেখার কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়। গীতগোবিন্দ-এর প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতেও রাগ ও তালের উল্লেখ রয়েছে এবং এটিও আংশিকভাবে গীতিনাট্যের লিব্রেটো হিসেবে রচিত।

এই তিন ধরনের প্রমাণ একত্র করলে এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যায় যে বাংলার মুসলিম সুলতানদের দরবার গীতগোবিন্দ-এর পরিবেশনা শৈলীটি গ্রহণ করেছিল। কাব্য, সংগীত ও নৃত্যের সমন্বয়ে একটি নতুন রূপকধর্মী আধেয় তৈরি করা হয়েছিল, যা মুসলিম শাসকদের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি ছিল অনেকটা মুঘল ও উত্তর ভারতীয় মুসলিম সামন্ত প্রভুদের গৃহীত প্রক্রিয়ার মতো।

লাইলি-মজনু ও সুফি প্রেমতত্ত্ব

শাহ মুহম্মদ সগিরের ইউসুফ-জোলেখা যদি স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সুফি দর্শনের একটি প্রচ্ছন্ন ব্যাখ্যা হয়, তবে বাহরাম খানের লাইলি-মজনু স্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীনভাবে সেই একই পথ অনুসরণ করেছে। লাইলি-মজনুর কাহিনিতে লাইলি ও কায়েসের কিংবদন্তিতুল্য প্রেমের বর্ণনা রয়েছে, যা প্রাগাধুনিক ও আধুনিক যুগে বাংলাসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে অসংখ্য সংস্করণে রচিত হয়েছে।

ষোলো শতকের লাইলি-মজনুর পরিবেশনাশৈলী পনেরো শতকের শাহ মুহম্মদ সগিরের ইউসুফ-জোলেখার মতো ছিল বলেই মনে হয়। কারণ এই কাব্যের অধিকাংশ অংশ পদ্যে বর্ণিত এবং সামান্য অংশ গীতিনাট্যের লিব্রেটো হিসেবে রচিত। এমনকি প্রতিটি পরিচ্ছেদের শুরুতে রাগ ও তালের উল্লেখ রয়েছে। প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে যে এই গীত-নৃত্যগুলো ‘রংমহলে’ পরিবেশিত হতো।

পীরদের গান ও যাত্রা: কৃষক সমাজের পরিবেশনা

সতেরো শতক থেকে বাঙালি মুসলিম কৃষিজীবী সমাজ স্বতন্ত্র পরিবেশনারীতি উদ্ভাবন করতে শুরু করে। তারা হিন্দু দেব-দেবীর স্তুতিমূলক পরিবেশনাশৈলী গ্রহণ করে সেখানে পীরদের মাহাত্ম্য প্রচারকারী নিজস্ব আখ্যানগুলো প্রতিস্থাপন করে। নামের শেষে ‘গান’ যুক্ত এই পরিবেশনাগুলো আজও বাংলাদেশে দেখা যায়। পদ্যে রচিত দীর্ঘ আখ্যানমূলক রচনার ওপর ভিত্তি করে এই পরিবেশনাগুলো গান, বাজনা, নৃত্য ও গদ্যে ব্যাখ্যামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ নাগাদ বাংলার মুসলিম কৃষক সমাজ পীরদের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য ভিন্ন ঘরানার এক বিশেষ পরিবেশনারীতি উদ্ভাবন করতে শুরু করে। নামের শেষে ‘যাত্রা’ যুক্ত এবং বর্তমানেও বাংলাদেশে ‘গাজীর যাত্রা’ ও ‘মানিক পীরের যাত্রা’ হিসেবে প্রচলিত এই পরিবেশনাগুলো সংলাপনির্ভর রচনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

পীরদের অলৌকিক মাহাত্ম্য প্রচারকারী প্রতিটি অনুষ্ঠানই অবধারিতভাবে গোঁড়া ইসলামি ধারার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল, যার মধ্যে ১৮১৮ সালে হাজি শরীয়তউল্লাহর নেতৃত্বে ফরায়েজি আন্দোলনের উত্থান ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই আন্দোলন হানাফি মাজহাবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী বিশ্বাসের চারটি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে কঠোর সুন্নি ইসলামি রীতিনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল।

বিশ শতকের শেষ থেকে এই পরিবেশনাগুলো ওয়াহাবি মতাদর্শী রক্ষণশীল ইসলামপন্থীদের চরম অসহিষ্ণুতার আরেকটি ঢেউ মোকাবিলা করছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বায়নের প্রসার এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির আগ্রাসনে এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় আলোচিত সব পরিবেশনা আজ দর্শক-চাহিদার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে পারে এবং অবধারিতভাবে বিলুপ্ত হতে পারে অথবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো পরিবেশনা–শৈলীতে রূপান্তরিত হতে পারে।