সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রবীন্দ্রনাথের আলোয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মোকাবিলার আহ্বান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, সম্প্রতি দেশে প্রতিক্রিয়াশীল ও মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থানের পেছনে লোভ ও শক্তির লড়াই রয়েছে। তিনি এই উত্থানকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না বলে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সংকটের একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আজ শুক্রবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দুই দিনের জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলনের উদ্বোধনীতে তিনি এই বক্তব্য রাখেন।
প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হুমকি ও রবীন্দ্রনাথের আলো
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্মেলনে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোকে মানবসভ্যতার জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই শক্তিগুলো মানুষের শাশ্বত সংস্কৃতি ও হাজার বছরের ঐতিহ্য ধ্বংস করতে চায় এবং মানুষকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে চায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই অন্ধকার থেকে বাঁচার জন্য রবীন্দ্রনাথের আলো আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
তিনি রবীন্দ্রনাথকে শুধু কবি হিসেবে নয়, বরং তাঁর দর্শনের মাধ্যমে চেনার আহ্বান জানান। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন ও রাজনৈতিক সচেতনতা ধারণ করতে হবে, কারণ তিনি একটি শোষণমুক্ত ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।
বিশ্বজুড়ে সংকট ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের নিষ্ঠুর প্রসার রবীন্দ্রনাথের সময় থেকে শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, সভ্যতার এই সংকট আজও কাটেনি; বরং সংকটের চেহারা আরও ভয়াবহ হয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় জীবন ও মুক্তির সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের প্রেরণা দিয়েছে। আমাদের জাতীয় সংগীতও রবীন্দ্রসংগীত। কাজেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন।’
জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের ভূমিকা ও অন্যান্য বক্তব্য
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাংস্কৃতিক অবক্ষয় রোধে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন পরিষদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। সম্মেলনে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সভাপতি মফিদুল হক বলেন, ধর্মের নামে ধর্মান্ধতা ও বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজকে আক্রান্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এই সবকিছু থেকে বের হয়ে আসার জন্য সংস্কৃতিকে আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে, কারণ বাংলার সংস্কৃতি সর্বাংশে অসাম্প্রদায়িক।
মফিদুল হক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সংগীতের গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সংগীতকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করা এবং সমাজের দায়িত্ব ও অংশীদারত্ব নিয়ে ভাবতে হবে।
সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা ও কার্যক্রম
‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’ গানটির মাধ্যমে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের নির্বাহী সদস্য ত্রপা মজুমদার অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন পরিষদের নির্বাহী সভাপতি বুলবুল ইসলাম।
স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক লিলি ইসলাম। তিনি বলেন, বাঙালির সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করছেন। লিলি ইসলাম বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের চেতনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। কিন্তু আমরা কেবল রবীন্দ্রসংগীতে সীমাবদ্ধ নই; বাঙালির বিশাল সংগীতের ঐশ্বর্য, যেমন লোকসংগীত, নজরুলসংগীত বা পঞ্চকবির গান—সবকিছুকেই আমরা আমাদের অন্তরে লালন করি।’
সম্মেলনের সময়সূচি ও প্রতিযোগিতা
সম্মেলন আজ শুক্র ও আগামীকাল শনিবার পর্যন্ত চলবে। আজ সন্ধ্যা ছয়টায় প্রদীপ প্রজ্বালন, সংগীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, আবৃত্তি ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সূচি রয়েছে।
সম্মেলন উপলক্ষে দেশজুড়ে সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আজ চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় ৫০ জন শিল্পী অংশ নেন। সাধারণ ও কিশোর—এ দুই বিভাগে প্রতিযোগিতা হয়। বিজয়ীদের পুরস্কার আগামীকাল দেওয়া হবে।
আগামীকাল প্যানেল আলোচনা, রবীন্দ্রপদক ও গুণীসম্মাননা, সংগীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান ও আবৃত্তি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।



