পদার্থবিজ্ঞানের ভয় কাটাতে এলেন এক রহস্যময় শিক্ষক
রেহানা তার মোটাসোটা পদার্থবিজ্ঞান বইয়ের দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বইটি ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে তার, কিন্তু আকার দেখে সাহস পাচ্ছে না। মাত্র তিন মাস পর পরীক্ষা, অথচ বইয়ের দিকে তাকাতেই তার ইচ্ছে করছে না। আগের রাতে পড়ার অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, শেষ মুহূর্তের পড়াশোনায় কোনো লাভ হয় না। তবুও দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বইটা হাতে নেয় সে। ঠিক তখনই দরজার কলবেল বেজে ওঠে।
দরজায় দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত আগন্তুক
দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন এক দীর্ঘাঙ্গী নারী। তাঁর চোখে পুরু চশমা, হাতে বড়সড় এক কালো হাতব্যাগ। রেহানা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে, মনে মনে ভাবে, এ নিশ্চয়ই ছেলেধরা। কিন্তু শিশু নয় বলে সে চিৎকার করে না। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে জিজ্ঞাসা করে, ‘কী চাই?’ আগন্তুক চশমা ঠিক করে বলেন, ‘এটা কি রেহানাদের বাড়ি?’ রেহানা আরও সন্দিহান হয়, কিন্তু আগন্তুকই আবার প্রশ্ন করেন, ‘তোমার ফিজিকস ভালো লাগে না?’
রেহানা অবাক হয়, আজকাল কিডন্যাপাররা পড়ালেখার খোঁজখবরও নেয়! সে নাক সিঁটকে উত্তর দেয়, ‘নাহ, ভালো লাগে না।’ আগন্তুক বলেন, ‘আমি ফিজিকস পড়াব তোমাকে, পড়বে?’ ঠিক তখনই রেহানার মা হাজির হন। আগন্তুকের দিকে তাকিয়েই তাঁর অভিব্যক্তি বদলে যায়। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘জি বলুন, কাকে চাই?’
মণি আপার পরিচয় এবং পড়ানোর প্রস্তাব
আগন্তুক নিজেকে মণি বলে পরিচয় দেন। তিনি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এবং রেহানাকে পড়িয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতে চান। রেহানার মা বেশ কিছু প্রশ্ন করে তাঁর সম্পর্কে নিশ্চিত হন, এবং সম্মতি দেন। তিনি শান্তশিষ্ট, ছিমছাম মণি আপাকে বেশ পছন্দ করে ফেলেন।
পড়াশোনায় জাদুর ছোঁয়া
মণি আপার পড়ানোর ধরন অসাধারণ। জাদুমন্ত্রের মতো কাটতে থাকে পড়ার সময়। রেহানা ভাবতেই পারেনি যে পদার্থবিজ্ঞান এত মজার আর সুন্দর হতে পারে। মণি আপা কখনো বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ে আসেন, কখনো ছবি এঁকে বুঝিয়ে দেন, আবার মাঝেমধ্যে বাইরে নিয়ে গিয়ে বল ছুড়ে বা ক্রিকেট খেলিয়ে বিজ্ঞানের নীতি ব্যাখ্যা করেন। নিজের অজান্তেই রেহানা পদার্থবিজ্ঞান ভালোবেসে ফেলে। এই ভালোবাসা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনেও এক নতুন অনুভূতি জাগায়।
দুই বছরের সাফল্য এবং একটি রহস্য
এভাবেই কেটে যায় দুটি বছর। স্কুলের পরীক্ষায় ভালো ফল করা এখন রেহানার কাছে সহজ হয়ে উঠেছে। এসএসসির ফিজিকস পরীক্ষার আগের দিন মণি আপা এসে রিভিশন দেখে সন্তুষ্ট হন। সে সময় রেহানার চোখ আটকে যায় মণি আপার কালো ব্যাগের ভেতরে। ব্যাগের জিপার খোলা আছে, ভেতরে কিছু কিলবিল করছে! রেহানা ভয় পেয়ে বলে, ‘আপা, আপনার ব্যাগের ভেতর ওটা কী?’ মণি আপা দ্রুত ব্যাগ বন্ধ করে বলেন, ‘পোকাই হবে হয়তো, টেনশন নিয়ো না, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নাও।’ বলেই তাড়াহুড়া করে চলে যান তিনি।
ফলাফলের দিন অদৃশ্য হওয়া
এসএসসির ফলাফলে রেহানা ফিজিকসে সর্বোচ্চ নম্বর পায়। সে খুশির খবর মণি আপাকে জানাতে চায়, কিন্তু আপা ফোন ধরছেন না। বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে, পরদিন মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে মণি আপার মেসে হাজির হয় রেহানা। সেখানে তাকে তাজ্জব হতে হয়, কারণ মণি আপা নামে কেউ সেই মেসে থাকেন না। অথচ তিনি এই ঠিকানাই দিয়েছিলেন।
গোপন সত্য উদ্ঘাটন
অন্যদিকে, মণি আপা তার ব্যাগের ভেতরের পোষা প্রাণীকে যত্ন করে খাওয়ান। তিনি নিজ গ্রহ থেকে বিতাড়িত হয়ে এসেছেন, এবং মানুষদের রক্ষা করতে, তাদের বিজ্ঞান এগিয়ে নিতে কাজ করছেন। চোখের মোটা চশমা খুলে তিনি তার চারটি ছলছল চোখ দিয়ে আকাশের দিকে তাকান। মনে মনে বলেন, ‘আসছে ওরা, মানুষদের রক্ষা করতে হবে, আর মাত্র কয়েক শ বছরের মধ্যে পৃথিবীর বিজ্ঞান এগিয়ে নিতে হবে।’ এরপর তিনি অন্য কোনো শিশুর সন্ধান শুরু করেন, যে পদার্থবিজ্ঞান পড়তে চায় না।
লেখক: শিক্ষার্থী, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুর। লেখাটি ২০২২ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত।



