সুফী মোতাহার হোসেনের নিবন্ধে আবুল হুসেনের জীবন ও সাহিত্যকর্মের গভীর মূল্যায়ন
বাংলা সাহিত্যের সনেটিয়ার হিসেবে খ্যাতিমান সুফী মোতাহার হোসেন (১৯০৭-৭৫) তাঁর লেখনীর মাধ্যমে আবুল হুসেনের জীবন ও কর্মকে অমর করে রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আবুল হুসেনের সান্নিধ্য লাভের পর, সুফী মোতাহার হোসেন মাসিক মোহাম্মদীর ১২ বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (কার্তিক ১৩৪৫) 'আবুল হুসেন' শীর্ষক একটি স্মৃতিচারণামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করেন। এই নিবন্ধটি আবুল হুসেনের সংগ্রামী জীবন, সাহিত্য সাধনা এবং মুসলিম সমাজে তাঁর অবদানকে বিশদভাবে তুলে ধরে, যা আজও গবেষকদের জন্য অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও অর্থসংস্থানের ভূমিকা
সুফী মোতাহার হোসেনের জীবন ও কর্মে মুসলিম সাহিত্য সমাজের (১৯২৬-৩৮) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি এই সংগঠনের তৃতীয় বর্ষের কর্মী হিসেবে সদস্য মনোনীত হন এবং অর্থসংস্থানের জন্য গঠিত একটি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই কমিটির আওতায়, শহরের মেস ও প্রাইভেট হাউস থেকে অর্থ সংগ্রহের ভার তাঁর ওপর অর্পণ করা হয়েছিল, যা সংগঠনের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ: সভার সংক্ষিপ্ত কার্যবিবরণী ১৯২৬-১৯৩৮' গ্রন্থে এই তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবুল হুসেনের জীবন ও সাহিত্যকর্মের বহুমুখী দিক
আবুল হুসেন ছিলেন একজন প্রখ্যাত অধ্যাপক, আইনজীবী এবং সাহিত্যিক, যিনি মুসলিম সমাজে জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রচনা 'মুসলিম কালচার' মুসলিম সমাজে ব্যাপক সমাদর লাভ করে এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষাপদ্ধতি বিষয়ে তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলো শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পথ প্রশস্ত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কমার্স বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর, তিনি কলকাতায় হাইকোর্টে আইন ব্যবসায় সফলতা অর্জন করেন, যদিও এই সময়ে সাহিত্য ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড কিছুটা হ্রাস পায়।
সুফী মোতাহার হোসেনের নিবন্ধে আবুল হুসেনের চরিত্রের দৃঢ়তা, সত্যাশ্রয়ী মনোভাব এবং জাতি ও ধর্মের প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিবন্ধটিতে আবুল হুসেনের একটি নবীন বয়সের ছবিও সংযুক্ত ছিল, যা অন্য কোথাও ব্যবহৃত হয়নি বলে জানা যায়। দুর্ভাগ্যবশত, এই নিবন্ধটি আবুল হুসেন বা সুফী মোতাহার হোসেনের জীবনীগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যা গবেষণার ক্ষেত্রে একটি শূন্যতা তৈরি করেছে।
আবুল হুসেনের রোগ ও অকাল মৃত্যুর প্রভাব
আবুল হুসেনের জীবনের শেষ দিকে তিনি ডিসপেপসিয়া ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, যা তাঁর স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সুফী মোতাহার হোসেন তাঁর নিবন্ধে এই রোগজীর্ণ চেহারার স্মৃতি উল্লেখ করে আবুল হুসেনের অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর ব্যথা প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, আবুল হুসেন দীর্ঘজীবী হলে সমাজ ও জাতি তাঁর থেকে আরও বহু বছর সেবা ও জ্ঞান লাভ করতে পারত।
সুফী মোতাহার হোসেনের এই নিবন্ধটি কেবল আবুল হুসেনের জীবনীই নয়, বরং বাংলা সাহিত্য ও মুসলিম সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি পাঠকদের কাছে আবুল হুসেনের বহুমুখী প্রতিভা ও অবদানকে নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেয়।



