মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে 'পুনঃকল্পনায় সুলতানার স্বপ্ন' প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে চার মাসব্যাপী 'পুনঃকল্পনায় সুলতানার স্বপ্ন' শীর্ষক বিশেষ দৃশ্যশিল্প প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক পর্দা নামানো হয়েছে। এই প্রদর্শনীটি আয়োজিত হয়েছিল বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কালজয়ী লেখা 'সুলতানার স্বপ্ন' ইউনেসকোর মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড (এশিয়া প্যাসিফিক) স্বীকৃতি অর্জন উদযাপনের অংশ হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান কলাকেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে জাদুঘরের চতুর্থ তলায় এই প্রদর্শনীটি স্থাপন করা হয়েছিল, যা গত বছরের ৬ ডিসেম্বর শুরু হয়ে চলতি বছরের ৭ মার্চ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহের কারণে সময় বাড়িয়ে আজ সমাপ্ত করা হয়েছে।
শিল্পীদের মাধ্যমে সুলতানার স্বপ্নের পুনঃকল্পনা
'সুলতানার স্বপ্ন' প্রকাশিত হওয়ার শত বছর পরেও এর প্রাসঙ্গিকতা বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিল্পমাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯ জন শিল্পী তাদের সৃজনশীলতা প্রদর্শন করেছেন। প্রদর্শনীর সহযোগী হিসেবে লাইব্রেরি উইদাউট বর্ডার্স এবং আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা অংশ নেয়। সমাপনী দিনে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যেখানে শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন এবং পরে 'প্রদর্শনী পরিভ্রমণ' অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এই প্রদর্শনীতে যে সাড়া পেয়েছি, তাতে আমরা উৎসাহিত হয়েছি।' তবে তিনি বর্তমান সময়ে জাদুঘরে মানুষের যাওয়া–আসা কমে যাওয়া নিয়ে হতাশাও প্রকাশ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও নারী জাগরণের উপর জোর
মফিদুল হক আরও উল্লেখ করেন যে মুক্তিযুদ্ধ ও নারী জাগরণের বিষয়ে আরও কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, 'সুলতানার স্বপ্নের বিষয়গুলো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি এই প্রদর্শনীর যেই বার্তা, সেটি অব্যাহত রাখতে হবে।' একই সঙ্গে তিনি প্রদর্শনী নিয়ে একটি প্রকাশনা করার কথাও উল্লেখ করেন। শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান বলেন, এই প্রদর্শনীতে সুলতানার স্বপ্নের অনুকরণে কাজের ধারা ঠিক করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে শিল্পীরা নিজেদের ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সঙ্গে সমকালীন শিল্পীদের আরও কাজের সুযোগের কথা বলেন এবং এই শিল্প প্রদর্শনী নিয়ে প্রকাশনা বের করার দাবি তুলে ধরেন।
প্রদর্শিত শিল্পকর্মের বিবরণ
'সুলতানার স্বপ্নভূগোল' প্রদর্শনীতে সুলতানার স্বপ্নের নানা পুনঃকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল:
- ফারজানা আহমেদ ঊর্মির 'সুলতানার স্বপ্নভূগোল'
- রুক্সিমিন চৌধুরীর 'যেসব ঘটনা নিশ্চিতভাবে ঘটেনি'
- দীপ্তি দত্তের 'স্বপ্নের বাইরে থেকে'
- জাফরিন গুলশানের 'আশা নিরবধি'
- জয়তু চাকমার 'সুলতানার স্বপ্ন কোথায় বিরাজমান'
- সালমা আবেদিন পৃথীর 'অদৃশ্য শ্রম'
- সুমনা আক্তারের 'স্বপ্ন'
- রাজীব দত্তের 'সুলতানাদের আকাশের আলো ও আঁধার'
- ইফাত রাজোয়ানা রিয়ার 'লেডিল্যান্ডে প্রবেশ: একটি নারীবাদী স্বপ্ন ইনস্টলেশন'
এছাড়াও অন্যান্য শিল্পকর্ম যেমন পলাশ ভট্টাচার্যের 'দরজা', এ এছেনের 'শরীর কোথায় মনে রাখে', হেলাল সম্রাটের 'হয়তো তুমি শিকারি বা শিকার', বিলাস মণ্ডলের 'স্বপ্নের সুতো', সৈয়দ সাইফের 'মর্দানা', রূপশ্রী হাজংয়ের 'সংগ্রাম', সাজিয়া রহমান সন্ধ্যার 'কাদেরাবাদের গল্প', ফারিহা জেবার 'শোনো…কথা বলার জন্য…', জান্নাতুল তামান্না লিজার 'খাঁচার পাখি যখন গায় গান' এবং আসাং মংয়ের 'জগতের ভেতরে জগৎ' প্রদর্শিত হয়েছিল।
শিল্পীদের প্রতিক্রিয়া ও বার্তা
শিল্পী সাজিয়া রহমান সন্ধ্যা বলেন, 'নারীদের জীবনসংগ্রাম ও স্বপ্নকে শিল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করলে তা দর্শকদের নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। এই প্রদর্শনী থেকে আমাদের একটিই বার্তা—নারীর শৃঙ্খলমুক্তির এই লড়াই সহজ নয়, তাঁকে প্রতিনিয়তই লড়াই করে যেতে হয়, যা ১০০ বছর আগেও ছিল, আজও আছে এবং চলবে।' সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক আবৃত্তিশিল্পী রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন শিল্পী দীপ্তি দত্ত, সাজিয়া রহমান সন্ধ্যা, সালমা জাকিয়া বৃষ্টি, ফারজানা আহমেদ ঊর্মি, সুমনা আক্তার প্রমুখ। এই প্রদর্শনীটি নারী অধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে শিল্পের মাধ্যমে পুনর্ব্যাখ্যা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



