অবরুদ্ধ শিল্পীর সময়হীন কক্ষে আত্মপরিচয়ের সংকট
অনেক দিন ধরে আমি সকাল ও সন্ধ্যার মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারি না। দরজার ফাঁক দিয়ে আসা ম্লান আলোয় সবকিছু একই রকম আবছা ও শান্ত মনে হয়। দূর থেকে রিকশার বেলের শব্দ কানে ভেসে আসে, কিন্তু সেটা বাস্তব নাকি কল্পনা, তা বুঝতে পারি না। এখন কি ভোর নাকি সন্ধ্যা? এই অনিশ্চয়তা আমাকে অস্থির করে তোলে।
আবু তালেবের রহস্যময় উপস্থিতি
আবু তালেব নামের এক ব্যক্তি আমার দেখাশোনা করে। তার মুখে শুধু দুটি প্রশ্ন: ‘খাইবেন নাকি বাথরুমে যাইবেন?’ এই রুটিন প্রশ্নে আমি বিরক্ত বোধ করি। কক্ষের দেয়ালে একটি বন্ধ ঘড়ি স্থিরভাবে আড়াইটা বাজিয়ে রাখে। একটি পুরোনো ক্যালেন্ডার ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস দেখায়, কিন্তু বর্তমান সময় সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। আবু তালেব প্রায়ই একটি সাদা খাতায় লেখালেখি করে। যখন জিজ্ঞেস করি, সে হেসে বলে, ‘কবিতা লিখি, স্যার। বন্দীর বন্দনা।’
আত্মপরিচয় হারানোর যন্ত্রণা
আমি নিজের নাম ভুলে গেছি। আবু তালেব বলে, ‘ভুলে যান, স্যার। নামধাম মনে রাখার দরকার নেই।’ তার শারীরিক গঠন দেখে বয়স অনুমান করা কঠিন। সে নীল শার্ট ও বিবর্ণ অ্যাপ্রন পরে থাকে। আমাকে খাবার দেয় ও বাথরুমে নিয়ে যায়। বাকি সময় সে কোণায় বসে লেখে। আমি বারবার জিজ্ঞেস করি, ‘আমাকে কি বন্দী করে রেখেছ? আমি কি অপরাধী?’ কিন্তু কোনো স্পষ্ট উত্তর পাই না।
অতীত স্মৃতির ঝলক
আমার আবছা মনে পড়ে, একসময় আমি হয়তো ছবি আঁকতাম বা গল্প লিখতাম। আমার স্ত্রীর নাম মিনু। তার সুরেলা কণ্ঠস্বর এখনও কানে বাজে। আবু তালেবের ফেলে যাওয়া বলপেন দিয়ে আমি দেয়ালে মিনুর নাম লিখি, যাতে ভুলে না যাই। আমাদের কি সন্তান ছিল? বারান্দায় কি ফুলের গাছ ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর আমার অজানা। সাদা দেয়ালটাকে এডগার অ্যালান পোর ‘দ্য র্যাভেন’-এর মতো মনে হয়, যেন তা বারবার বলে, ‘আর কখনোই নয়।’
মাস্টার সাহেবের নির্মম জেরা
একদিন মাস্টার সাহেব নামের এক ব্যক্তি কক্ষে আসেন। তিনি ক্লিন শেভড, চশমাপরা ও শীতল দৃষ্টির অধিকারী। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘অস্ত্রগুলো কোথায় রেখেছেন?’ আমি উত্তরে বলি, ‘আমি একজন শিল্পী। রংতুলি ছাড়া শিল্পীর কোনো অস্ত্র নেই।’ তিনি হেঁয়ালি না করে সরাসরি উত্তর দিতে বলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কার হয়ে কাজ করছেন? কত টাকা পেয়েছেন?’ এই প্রশ্নগুলো আমি বহুবার শুনেছি। শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি ও ঘুমিয়ে যাই।
আত্মগোপনের রহস্য
আবু তালেব ফিসফিস করে বলে, ‘আপনি তো আত্মগোপনে আছেন, স্যার। স্বেচ্ছায় নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন।’ আমি বিভ্রান্ত হয়ে যাই। কেন আমি ইচ্ছা করে লুকিয়ে থাকব? আবু তালেব বলে, ‘আমরা শুধু আপনাকে শেল্টার দিয়েছি।’ আবার সবকিছু গুলিয়ে যায়। আমি যেন অতল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমি কি নিজের ইচ্ছাতেই আটকে আছি, নাকি আমাকে জোর করে আটকে রাখা হয়েছে?
শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক বিপর্যয়
একদিন এক অচেনা ব্যক্তি আমার ওপর ঝুঁকে পড়ে প্রশ্ন করে, ‘তোমার সঙ্গে আর কারা ছিল?’ আমি বলি, ‘আমি একা।’ সঙ্গে সঙ্গে সে আমার গালে চপেটাঘাত করে। একের পর এক আঘাতে আমি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। ঠোঁট কেটে রক্ত বের হয়। আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাই। যদি আমি সত্যিই আত্মগোপনে থাকি, তবে এই অত্যাচার কেন? আমি কি কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত?
মুক্তির বিভ্রান্তি
আবু তালেব আবার আসে ও বলে, ‘বাথরুমে যাইবেন, স্যার?’ আমি ছটফট করে উঠি, ‘আমি বাইরে যাব।’ সে নির্বিকারভাবে বলে, ‘যান। আপনি মুক্ত।’ আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। সত্যি কি আমি মুক্ত? আমি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, কিন্তু পা দুটোতে কোনো জোর নেই। যেন সেগুলো কাঠের তৈরি। আমি আর্তনাদ করে উঠি, ‘তোমরা আমার হাঁটার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছ!’ আবু তালেব হো হো করে হাসে, আর সেই হাসি চারপাশের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।



