আবুল মনসুর আহমদ: বর্তমান সমাজের জন্য এক অপরিহার্য দলিল
আবুল মনসুর আহমদ: বর্তমান সমাজের দলিল

আবুল মনসুর আহমদ: বর্তমান সমাজের জন্য এক অপরিহার্য দলিল

আবুল মনসুর আহমদ (৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮—১৯ মার্চ ১৯৭৯) বিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সমাজের নবজাগরণ, রাজনৈতিক বিবর্তন ও সাহিত্যচর্চায় এক দুর্লভ ও বহুমাত্রিক চরিত্র হিসেবে স্বীকৃত। ১৮৯৮ সালে ময়মনসিংহের ধানিখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এই ব্যক্তিত্ব আধুনিক বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অগ্রগণ্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে যখন আমরা সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক আদর্শের সংকট ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যের মুখোমুখি দাঁড়াই, তখন আবুল মনসুর আহমদের প্রাসঙ্গিকতা কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য দলিলে পরিণত হয়।

ব্যঙ্গ সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ ব্যবচ্ছেদ

আবুল মনসুর আহমদের প্রাসঙ্গিকতার প্রধানতম ভিত্তি হলো তাঁর অপরাজেয় ব্যঙ্গ সাহিত্য বা স্যাটায়ার। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ আয়না বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই গ্রন্থে তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি, ভণ্ড পীর-মুরিদি প্রথা এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা কুসংস্কারকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে আক্রমণ করেছেন। ‘হুজুর কেবলা’, ‘নায়েবে নবী’ বা ‘ধর্মরাজ্য’র মতো গল্পগুলোয় তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ধর্মের পবিত্র লেবাস পরে একদল মানুষ সাধারণ মানুষকে শোষণ করে। আজ প্রায় এক শতক পরও আমাদের সমাজে সেই ভণ্ডামির কোনো কমতি নেই, বরং তা নতুন নতুন মোড়কে আত্মপ্রকাশ করেছে।

ফুড কনফারেন্স: রাষ্ট্রযন্ত্রের বিকল কলকবজার চিত্র

অন্যদিকে ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত আবুল মনসুর আহমদের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ কীর্তি ফুড কনফারেন্স। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তরের (১৯৪৩) ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে লেখা এই বইয়ের গল্পগুলো আজও আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিকল কলকবজার দিকে আঙুল তোলে। ফুড কনফারেন্স গল্পে তিনি দেখিয়েছেন, যখন নিরন্ন মানুষ খাদ্যের অভাবে রাস্তায় প্রাণ দিচ্ছে, তখন তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ ও ‘নেতৃস্থানীয়’ ব্যক্তিরা কনফারেন্সের নামে ভূরিভোজ করছে এবং নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। বর্তমানের বাজার সিন্ডিকেট, কৃত্রিম খাদ্যসংকট ও মজুতদারির মাধ্যমে মানুষের পকেট কাটার যে সংস্কৃতি, তার সঙ্গে ফুড কনফারেন্স-এর চরিত্রগুলোর অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

উপন্যাস ও ভাষাচিন্তায় গভীর মমত্ববোধ

আবুল মনসুর আহমদের উপন্যাসগুলোও সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জীবনক্ষুধা উপন্যাসে তিনি গ্রামীণ ও নাগরিক সমাজের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনসংগ্রামের এক নিপুণ চিত্র এঁকেছেন। এ ছাড়া সত্যমিথ্যাআবে হায়াত উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং নৈতিকতার দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ব্যঙ্গ সাহিত্যের বাইরে তাঁর এই সৃষ্টিশীল রচনাগুলো প্রমাণ করে, তিনি কেবল বিদ্রূপ করতেই জানতেন না, বরং মানুষের প্রতি তাঁর ছিল গভীর মমত্ববোধ।

তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের কাজ কেবল বিনোদন দেওয়া নয়, বরং সমাজের জঞ্জাল পরিষ্কার করা। তাঁর ভাষাচিন্তাও ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক। তিনি প্রমিত বাংলার পাশাপাশি পূর্ব বাংলার মানুষের মুখের ভাষা ও শব্দভান্ডারকে সাহিত্যে স্থান দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। তাঁর মতে, কৃত্রিম আভিজাত্যের চেয়ে গণমানুষের প্রাণবন্ত ভাষাই সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ বাহন।

রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা

আবুল মনসুর আহমদ কেন আজও প্রাসঙ্গিক, এর একটি বড় কারণ হলো তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও যুক্তিবাদী চেতনা। তিনি বাঙালি মুসলমানের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা বলতেন, কিন্তু তা কখনোই অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে নয়। তিনি চেয়েছিলেন একটি আধুনিক, শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ। তাঁর মতে, বিবেকহীন মানুষের হাতে পরিচালিত রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের কোনো বিবেক থাকে না।

রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ক্ষেত্রে আবুল মনসুর আহমদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক ‘২১ দফা’ ইশতেহারের মূল রূপকার হিসেবে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের যে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, এর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি প্রথম থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছিলেন এবং দুই পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্যকে সংসদীয় বিতর্কে অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।

সাংবাদিকতায় নির্ভীক পথিকৃৎ

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন এক নির্ভীক পথিকৃৎ। দৈনিক ইত্তেহাদ, দৈনিক নবযুগ বা দৈনিক মোহাম্মদীর মতো পত্রিকায় তাঁর সাহসী সম্পাদনা ও সম্পাদকীয় লেখনী তৎকালীন জনমত গঠনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। তিনি সাংবাদিকতাকে কেবল পেশা হিসেবে নয়, বরং শোষিতের কণ্ঠস্বর হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানের করপোরেট নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের যুগে তাঁর নৈতিকতা ও অকুতোভয় সাংবাদিকতা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা

দুর্নীতি, লুটপাট এবং মূল্যবোধের যে চরম অবক্ষয় আমরা বর্তমানে প্রত্যক্ষ করছি, তার সঠিক রোগনির্ণয় আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্যে বহু আগেই করা হয়েছে। তাঁর ‘লঙ্গরখানা’ বা ‘রিলিফওয়ার্ক’ গল্পগুলো পাঠ করলে মনে হয় যেন লেখক বর্তমান সময়ের ত্রাণ চুরির মহোৎসবকেই উপজীব্য করেছেন। রিজেন্ট শাহেদের মতো আধুনিক প্রতারকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যে বহু আগে তাঁর ‘এআইসিসি’ গল্পের শহীদ চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছিল, তা ভাবলে তাঁর দূরদর্শিতা দেখে বিস্মিত হতে হয়।

শেষে বলা যায়, আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন একাধারে সাহিত্যের জাদুকর, রাজনীতির ধীমান কারিগর এবং সমাজের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক। তাঁর লেখনী কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা চিরকালীন মানবচরিত্রের দুর্বলতা ও অসংগতিগুলো ধারণ করে আছে। অন্নদাশঙ্কর রায় যথার্থই বলেছিলেন, ‘আয়না লিখিয়া আবুল মনসুর আহমদ প্রাতঃস্মরণীয় হইয়াছিলেন, ফুড কনফারেন্স লিখিয়া তিনি অমর হইলেন।’ বর্তমান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমরা যত বেশি সংকটের সম্মুখীন হচ্ছি, আবুল মনসুর আহমদের প্রাসঙ্গিকতা তত বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।