আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: নিম্নবর্গের ভাষিক ক্ষমতায়ন ও সাহিত্যের বিপ্লবী বয়ান
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: নিম্নবর্গের ভাষিক ক্ষমতায়ন

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: সাহিত্যে নিম্নবর্গের বিপ্লবী উচ্চারণ

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এক অনন্য প্রতিভা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। মাত্র দুটি উপন্যাস, কয়েকটি গল্পগ্রন্থ ও সীমিত প্রবন্ধ রচনা করেও তিনি অমরত্ব অর্জন করেছেন। মহাশ্বেতা দেবী তার সম্পর্কে লিখেছেন, "কী পশ্চিম-বাংলা, কী বাংলাদেশ, সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক।" এটি নিছক স্তুতিবাক্য নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের বাস্তবতা।

মধ্যবিত্তের ভাষিক মনোপলি ভাঙার যোদ্ধা

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, কিন্তু তার লেখায় মধ্যবিত্তের গতানুগতিক প্রভুত্ব নস্যাৎ হয়ে যায়। তিনি নিম্নবর্গকে ভাষিক বয়ানের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। ইলিয়াস নির্মোহ ভঙ্গিতে সমাজের স্বপ্ন দেখাতে চেয়েছেন, যদিও তার উপন্যাসে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা উপস্থিত, তবুও সাম্য ও মুক্তির আশা অটুট রয়েছে।

ইলিয়াসের মতে, নিম্নবর্গের প্রতিরোধ ও বিকল্প বয়ানের মৃত্যু নেই। তার ভাষ্যে, শেষ পর্যন্ত খোয়াব দেখতেই হয়—যা ব্রাত্যজনের স্বপ্ন ও সংগ্রামের বয়ান। মধ্যবিত্তের চেতনা ও ভাষিক একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে তিনি সাহিত্যে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছেন। মধ্যবিত্তের অবসাদ নিষ্ক্রিয়তা জন্ম দেয়, কিন্তু নিম্নবর্গের চরিত্ররা কাঠামোগত অবিচারের শিকার হয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়।

ইতিহাসের গতি পরিবর্তন: নিম্নবর্গের দিকে

ইলিয়াস নিজেও মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী ছিলেন, কিন্তু তার উপন্যাসে মধ্যবিত্ত বিলুপ্ত না হয়ে কেন্দ্রীয়তা হারায়। ইতিহাসের গতি সরে যায় নিম্নবর্গের দিকে। মধ্যবিত্ত পালাবার স্বপ্ন দেখে, আর নিম্নবর্গ রূপান্তরের স্বপ্ন দেখে—এই রূপান্তরমুখী স্বপ্নেই ভবিষ্যতের বীজ নিহিত।

তার উপন্যাসগুলোর পটভূমি গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক আন্দোলন ও অস্তিত্বের লড়াইকে কেন্দ্র করে। 'চিলেকোঠার সেপাই' উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রচিত, আর 'খোয়াবনামা' কৃষক আন্দোলন ও তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস ধারণ করে। সাধারণত রাজনীতি ও সাহিত্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপেক্ষিত হয়, কিন্তু ইলিয়াস এই দ্বিচারিতা চুরমার করে এগিয়েছেন।

'চিলেকোঠার সেপাই': বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তির আখ্যান

এই উপন্যাসে ওসমান চরিত্রের মাধ্যমে মধ্যবিত্তের বিচ্ছিন্নতা ও আত্মপ্রেমের চিত্র ফুটে উঠেছে। ওসমান দেশবিভাগের কারণে উদ্বাস্তু হয়ে ঢাকায় আসে, সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন ও ছিন্নমূল জীবনযাপন করে। সে সবকিছু দেখে, শোনে, কিন্তু কোনো কিছুতেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে না। তার বিচ্ছিন্নতা চিলেকোঠার চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকে।

উপন্যাসের শেষে হাড্ডি খিজির নামক এক শ্রমিকের প্রেরণায় ওসমান ঘরের তালা ভেঙে বেরিয়ে আসে। চিলেকোঠার বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়ে তার সামনে অজস্র পথ খুলে যায়। এই উপন্যাসে ওসমানের বিচ্ছিন্নতাবাদের বিপরীতে হাড্ডি খিজিরের সাহসী ও সংগ্রামী জীবন তুলে ধরা হয়েছে। সমাজের তথাকথিত নিম্নস্তরের একজন সামান্য শ্রমিকই ওসমানের মুক্তি আকাঙ্ক্ষী সত্তাকে জাগিয়ে তোলে।

'খোয়াবনামা': কৃষক শ্রেণির স্বপ্নের মহাকাব্য

'চিলেকোঠার সেপাই' রচনার প্রায় ২০ বছর পরে প্রকাশিত 'খোয়াবনামা' আরো বিশাল পটভূমি, প্রেক্ষাপট ও স্বপ্ন নিয়ে রচিত। তেভাগা আন্দোলনের পটভূমিতে নির্মিত এই উপন্যাসে লোককথা, স্বপ্ন, স্মৃতি ও রাজনৈতিক বিদ্রোহ একত্রে গাঁথা। ইলিয়াস এখানে কৃষককে কেন্দ্রে এনেছেন, নগরের শ্রমজীবী বা মধ্যবিত্তকে নয়।

এই উপন্যাসে তমিজের বাপ এক বিচিত্র চরিত্র—তার জন্ম বা মৃত্যুর হদিশ নেই, এমনকি নাম পর্যন্ত জানা যায় না। মুখে মুখে শ্লোক আওড়ে গ্রামের লোকের ব্যাখ্যাতীত স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে বেড়ায় সে। এই উপন্যাস যেমন শুরু হয়েছিল তমিজের বাপের স্বপ্ন দিয়ে, শেষ হয় তমিজের বউ ফুলজানের স্বপ্ন দিয়ে, যা নিম্নবর্গের আন্তঃপ্রজন্ম সঞ্চারকে নির্দেশ করে।

নিম্নবর্গের ভাষিক ক্ষমতায়ন

ইলিয়াস শুধুমাত্র নিম্নবর্গের চরিত্রদের তার কথাসাহিত্যের কেন্দ্রে আনেননি, তাদের শব্দ, চেতনা ও অবচেতন তথা ভাষাকেও জীবন্ত করেছেন। তিনি গালিগালাজ ব্যবহার করেছেন বাংলা সাহিত্যে অভূতপূর্ব মাত্রায়, যা নিম্নবর্গের ভাষাভিত্তিক প্রতিরোধের ছবি তুলে ধরে। খিজির গালি ছাড়া কথাই বলে না, আর গিরিলডাঙ্গা গ্রামের মাঝি নানা ভাষায় গালি ব্যবহার করে।

ইলিয়াসের ব্রাত্যজনেরা তাদের মতো করেই খিস্তি করে আর অবলীলায় আঞ্চলিক উপভাষায় কথা বলে। ফলে তার গল্পে তেজস্ক্রিয়তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের মনে। শ্রেণি দ্বন্দ্ব, ধনবৈষম্য, নব্য সামন্ত শ্রেণির আবির্ভাব এবং প্রান্তিক জনের সর্বহারা করণ প্রক্রিয়ার ফাঁসিক রূপ হচ্ছে এই স্ল্যাং ও খিস্তির ব্যবহার।

সাহিত্যিক উত্তরাধিকার: তত্ত্ব নয়, আখ্যানের মাধ্যমে উত্তর

গায়ত্রী স্পিভাক প্রশ্ন রেখেছিলেন, "নিম্নবর্গেরা কি কথা বলতে পারে?" ইলিয়াস তার উপন্যাসে অনেক আগেই দেখিয়েছেন নিম্নবর্গ ইতিহাসের দিক নির্দেশক হয় আর আগামী ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। তিনি তত্ত্বের আশ্রয় নেননি, বরং আখ্যানের মাধ্যমে সম্ভাব্য উত্তর নির্মাণ করেছেন। তার উপন্যাসে সাবঅল্টার্ন কেবল কথা বলে না—তারা অর্থ-উৎপাদনের ক্ষেত্রকেই পুনর্গঠিত করে।

ইলিয়াসের ডায়েরিতে লেখা আছে, "ভোটের রাজনীতিতে দরকার পোস্টার, আর বিপ্লবের জন্য চাই সাহিত্য।" তার সাহিত্যভবন বিশেষ করে প্রান্তজনের ভাষা সেই সাহিত্যের প্রতিফলন। সামন্ততন্ত্রের অবশেষ ভেঙে পড়বে নিম্নবর্গের সচেতন আন্দোলনে—এই বিশ্বাসই তার সাহিত্যের মৌলিক চেতনা।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাসে আত্মপ্রেমিক ও প্রবঞ্চক উচ্চবর্গের বিপরীতে নিম্নবর্গ সচল, সরব ও ইতিহাসের গতিরেখা নির্ণায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়। তার সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যেখানে নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বর প্রধান হয়ে উঠেছে।