গ্রাফোম্যানিয়া: বই লেখার অদম্য বাসনা ও তার সামাজিক প্রভাব
প্যারিসের এক ট্যাক্সিচালকের উক্তি অনুসারে, অনেকেই বই লিখে থাকেন কারণ পরিবারে তাদের কথা আর শোনা হয় না। এই অক্ষমতার ফলেই বাইরের বিশ্বে শ্রোতা খোঁজার তাগিদে বই লেখা হয়ে ওঠে এক ধরনের কানানুসন্ধান। মিলান কুন্ডেরার উপন্যাস দ্য বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং-এ এই সাধারণীকরণের মাধ্যমে গ্রাফোম্যানিয়া ধারণার অবতারণা করা হয়েছে।
গ্রাফোম্যানিয়া কী এবং কেন এটি মহামারির রূপ নিচ্ছে
গ্রাফোম্যানিয়া হলো বই লেখার তীব্র ও অদম্য বাসনা, যা কেবল চিঠিপত্র বা ডায়েরি লেখার বাতিক নয়, বরং অথরশিপ বা লেখক হওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা। কুন্ডেরার মতে, এই গ্রাফোম্যানিয়া মানুষের আদিরোগ, যা বইয়ের জন্মের চেয়েও প্রাচীন। আধুনিক সমাজে, বিশেষ করে অর্থবিত্তে এগিয়ে থাকা সমাজগুলোতে, এটি এক মহামারির রূপ ধারণ করেছে।
কুন্ডেরা তিনটি পূর্বলক্ষণ উল্লেখ করেছেন যা গ্রাফোম্যানিয়ার বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে:
- প্রথমত, সমাজে বৈষয়িক সমৃদ্ধি ও অলস অবকাশের প্রাচুর্য দেখা দিলে।
- দ্বিতীয়ত, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাওয়ার ফলে ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ বোধ করলে।
- তৃতীয়ত, সমাজে নিস্তরঙ্গতা ও স্থবিরতা বিরাজ করলে, যদিও নানান ঘটনা ঘটছে।
এই অবস্থায় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সকলের মধ্যেই লেখক হওয়ার বাসনা জেগে উঠতে পারে, যেন সম্মিলিতভাবে সবাই ঘোষণা দেয়: ‘আমরা সবাই লেখক।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে গ্রাফোম্যানিয়ার পরিণতি
কুন্ডেরা ১৯৭৯ সালে যে দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়েছে। ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে প্রত্যেকে এখন লেখক, বক্তা ও নির্মাতায় পরিণত হয়েছেন। মতপ্রকাশের সুযোগ উন্মুক্ত হলেও এর উল্টো পিঠে লুকিয়ে আছে গভীর সংকট।
প্রত্যেকে নিজের ‘দেয়ালে’ এক সার্বভৌম লেখকত্বের প্রাচীর তুলে দিচ্ছেন, যার ওপারে পাঠকসমাজ বলতে কিছুই নেই। কারণ, প্রত্যেকের প্রাচীরের ঠিক ওপারেই আরেকজনের লেখকত্বের চৌহদ্দি অবস্থান করছে। এই অবস্থা রল্যাঁ বার্থের ‘লেখকের মৃত্যু’ ধারণার সাথে মিলে যায়, যেখানে লেখার অর্থের ওপর মালিকানা হারিয়ে আমরা সবাই মৃত লেখকে পরিণত হচ্ছি।
পোস্ট-লিটারেট সমাজ: বই পড়ার সংকট ও তার ভবিষ্যৎ
জেমস ম্যারিয়ট নামক ব্রিটিশ লেখক গ্রাফোম্যানিয়ার চেয়েও বড় এক দুঃস্বপ্নের কথা বলেছেন, যা পাঠকের দিক থেকে উদ্ভূত। তাঁর মতে, বর্তমান যুগে আমরা শুধু বই পড়ছি না, বরং পড়তেই ভুলে যাচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবের বিপুল অডিওভিজ্যুয়াল কনটেন্টের সমুদ্রে আমরা ডুবে থাকায় পাঠ বা রিডিং কর্মটি তার আবশ্যিকতা হারাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর কক্ষে আজকাল বইপাঠরত তরুণদের দেখা যায় না, যা শুধু অভ্যাসের বদল নয়, বরং সমাজের গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ম্যারিয়টের ‘দ্য ডন অব দ্য পোস্ট-লিটারেট সোসাইটি’ নিবন্ধে তিনি সতর্ক করেছেন যে, আমরা একটি পরক্ষর সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে বইপাঠ উঠে গেলে ছাপাখানা-পূর্ব দশায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিবর্তন মানবচিন্তার দীর্ঘ শৃঙ্খলাবদ্ধ অবয়ব সৃষ্টির ক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলছে, কারণ বইয়ের মাধ্যমেই এই ধারণাগুলো পূর্ণতা পায়। কার্ল মার্ক্সের ডাস ক্যাপিটাল-এর মতো গ্রন্থ না লিখলে তাঁর বৈপ্লবিক ধারণা বিকশিত হতো না। পোস্ট-লিটারেট সমাজে এই মূল্যবান সম্পদ বিসর্জন দেওয়া হতে পারে, যা মানবসভ্যতার জন্য এক দুর্মূল্য ক্ষতি।
সামগ্রিকভাবে, গ্রাফোম্যানিয়া ও পোস্ট-লিটারেট সমাজের ধারণাগুলো বই লেখা ও পড়ার বর্তমান সংকটকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তন মানবসমাজের মৌলিক চর্চাগুলোকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।
