রহমান মুফিজের 'এত জাদুকর': ব্যক্তিগত থেকে বৈশ্বিক প্রতিবাদের কবিতা
সমকালীন বাংলা কবিতার ইতিহাসে অধিকাংশ কবি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্মমগ্নতায় নিমজ্জিত থাকলেও, কবি রহমান মুফিজ তাঁর 'এত জাদুকর' কাব্যগ্রন্থে চেনা ছকের বাইরে পা রেখেছেন। তিনি কবিতাকে কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির বাহন না করে, মহাকালের দর্পণ, শোষিত মানুষের ইশতেহার এবং বৈশ্বিক নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ শ্লেষাত্মক দলিল হিসেবে গড়ে তুলেছেন। ১৯৭৯ সালের ১৭ মে কক্সবাজারের চৌফলদন্ডীতে জন্মগ্রহণকারী এই কবি ইতোমধ্যেই 'বাজি রাখো চোখ', 'খুনের কলাকৌশল' ও 'বিষনগর'-এর মতো গ্রন্থ দিয়ে পাঠকদের মনোযোগ কেড়েছেন।
বৈশ্বিক বাস্তবতা ও কবিতার শক্তি
'এত জাদুকরে' রহমান মুফিজ বিশ্বরাজনীতি থেকে মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি, ফিলিস্তিনের রক্তপাত থেকে বাংলার রাজপথের গণঅভ্যুত্থান এবং নিবিড় প্রেমের শূন্যতা থেকে অস্তিত্বের সংকটকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। গ্রন্থের অন্যতম শক্তিশালী কবিতা 'শান্তা ক্লজের হাসি' আধুনিক সভ্যতার বর্বরতা ও পুঁজিতান্ত্রিক উৎসবকে নির্মম ব্যঙ্গাত্মক তুলিতে এঁকেছে। ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৩ সালে লেখা এই কবিতাটি গাজা বা ফিলিস্তিনের গণহত্যার রক্তাক্ত প্রতিলিপি হিসেবে কাজ করে। কবিতায় মিকেলেঞ্জেলোর 'পিয়েতা' ভাস্কর্যকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে মানবসভ্যতার অগ্রগতিকে মারণাস্ত্র ও শিশুমৃত্যুর সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক রূপক
রহমান মুফিজ অভাবনীয় মুনশিয়ানায় প্রাত্যহিক জীবনের তুচ্ছ অনুষঙ্গ ব্যবহার করে গভীর রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করেন। 'ডিওডরেন্ট শেষ হয়ে গেলে' কবিতায় একটি ডিওডরেন্ট বোতল শেষ হয়ে যাওয়া মধ্যবিত্তের অন্তর্গত দৈন্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি পুঁজিবাদী সমাজে কৃত্রিম আভিজাত্যের আবরণ খসে পড়ার গল্প বলে। একইভাবে, 'মহররম' কবিতায় কারবালার ট্র্যাজেডিকে বাংলার সমসাময়িক মুক্তিসংগ্রামের সাথে মিলিয়ে দিয়ে শোষিত জনতার দ্রোহ ফুটে উঠেছে। 'আবু সাইদ' নামটি এখানে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক রূপক হিসেবে কাজ করে, যা আধুনিক সময়ের কারবালার শহিদের প্রতিনিধিত্ব করে।
প্রেম, শূন্যতা ও ভাষার নির্মাণশৈলী
সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি রহমান মুফিজের কবিতায় প্রেম এবং শূন্যতাবোধ এক ভিন্ন মাত্রায় ধরা দেয়। তাঁর প্রেম রোমান্টিক যুগের মতো পেলব নয়; বরং তা বাস্তব, রূঢ় এবং অনেক ক্ষেত্রে আততায়ীর মতো। 'প্রেম এক শিশুপ্রবৃত্তি' কবিতায় প্রেমের উদ্ভবকে এক আদিম ও আকস্মিক ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়েছে। 'হোমারের চোখ' কবিতায় প্রেমিকের অনুপস্থিতি এবং স্মৃতির ভার এক মহাজাগতিক রূপ পেয়েছে, যেখানে বিরহ কেবল মানসিক কষ্ট নয়, এক ধরনের ইন্দ্রিয়গত শূন্যতা তৈরি করে।
রহমান মুফিজের ভাষারীতি একই সাথে প্রাত্যহিক ও ধ্রুপদী। তিনি অতি আধুনিক নাগরিক শব্দ যেমন ডিওডরেন্ট, হেডফোন, শাওয়ারের পাশাপাশি পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক শব্দবন্ধ যেমন প্যান্ডোরার সিন্দুক, হোমারের চোখ, মিকেলেঞ্জেলোর সার্থক ব্যবহার করেছেন। এই দুই বিপরীতধর্মী শব্দভাণ্ডারের মিথস্ক্রিয়ায় তাঁর কবিতা এক পরাবাস্তব আবহ তৈরি করে। তাঁর উপমা নির্মাণ রীতি মেদহীন ও ধারালো, যেমন 'খুনির সহজ নাম নিয়ে হানা দেয় হাওয়া' বা 'বিহ্বল বসন্ত আসছে মৃত্যু খুঁড়ে খুঁড়ে'।
গ্রন্থের নাম ও সার্বিক প্রভাব
'এত জাদুকর' নামটির মধ্যেই এক গভীর পরিহাস লুকিয়ে আছে। এই জাদুকররা কারা? যারা পৃথিবীতে যুদ্ধ বাধিয়ে শান্তির কথা বলে, যারা পুঁজিবাদী ফাঁদ পেতে মানুষের আত্মা কিনে নেয়, নাকি সেই রাষ্ট্রযন্ত্র যা অধিকার হরণ করে জাদুর মতো সব আড়াল করে রাখে? রহমান মুফিজ তাঁর কবিতায় এই সব জাদুকরদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। তাঁর কবিতা পড়ে মনে হয় না তিনি কেবল ছন্দ মেলানোর জন্য শব্দ সাজিয়েছেন; প্রতিটি কবিতা যেন তাঁর যাপিত জীবনের গভীরতম ক্ষত থেকে উঠে আসা এক একটি দীর্ঘশ্বাস এবং গগনবিদারী চিৎকার। ফিলিস্তিনের মৃত শিশু থেকে বাংলার রাজপথে বুলেটবিদ্ধ আবু সাইদ—সবাই তাঁর কবিতার আশ্রয়ে অমরত্ব পেয়েছে। আবার একই সাথে মধ্যরাতের একাকী ছাদ, হেডফোনের গান ও ফুরিয়ে যাওয়া ডিওডরেন্টের বোতল প্রমাণ করে তিনি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুব কাছের এক নিবিড় পর্যবেক্ষক।
গ্রন্থের বিবরণ: 'এত জাদুকর'। লেখক: রহমান মুফিজ। প্রকাশক: জাগতিক। প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত। মূল্য: ২৫০ টাকা।
