শঙ্খ ঘোষ থেকে ইরফান হাবিব: কেন আজও প্রাসঙ্গিক মুহাম্মদ ইকবাল?
শঙ্খ ঘোষ থেকে ইরফান হাবিব: ইকবালের প্রাসঙ্গিকতা

মুহাম্মদ ইকবাল: একটি জটিল প্রতিভার পুনর্মূল্যায়ন

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, 'হঠাৎ কেন ইকবাল?' কিন্তু মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৭) নিছক কোনো আকস্মিক আলোচনার বিষয় নন। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে বাংলা সাহিত্য ও দর্শনের প্রেক্ষাপটে। ই এম ফরস্টার থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বহু মনীষী ইকবালের কবিতাকে 'বিশ্বজনীন' বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবুও, তাঁর প্রতি সন্দেহের দৃষ্টি রয়ে গেছে, যা মূলত তাঁর অনুরাগীদের কিছু কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক প্রয়োজনের ফল।

রাজনৈতিক বিবর্তন ও সাহিত্যিক প্রতীক

ইকবাল শুরুতে অখণ্ড ভারতের পক্ষপাতী ছিলেন, তাঁর 'সারে জাহাঁ সে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা' গান তার প্রমাণ। কিন্তু ১৯২৪ সালে প্রকাশিত 'বাংগ-এ-দারা' কাব্যগ্রন্থে তিনি পরাধীন ভারতের মুক্তির জন্য রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার করেন। এখানে রামকে 'ইমাম-এ-হিন্দ' হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা ধর্মীয় নেতা নয়, বরং মুক্তির প্রতীক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের যুগে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মুখে ইকবালের মত পরিবর্তিত হয়, এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থকরা তাঁকে 'স্বপ্নদ্রষ্টা' হিসেবে দাবি করেন। তবে, তিনি চরম জাতিগর্বী না হয়ে সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

শঙ্খ ঘোষের অনুবাদ ও বাংলায় ইকবাল চর্চা

বাংলা ভাষায় ইকবাল চর্চায় শঙ্খ ঘোষের 'ইকবাল থেকে' বইটি একটি মাইলফলক। এই গ্রন্থে অনুবাদ, সুদীর্ঘ ভূমিকা এবং সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের সঙ্গে পত্রালাপের মাধ্যমে ইকবালের অজানা দিকগুলো উন্মোচিত হয়েছে। ইকবালের কেমব্রিজ জীবনের বান্ধবী আতিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বর্ণনা থেকে তাঁর কবিমানসের দ্বন্দ্বও স্পষ্ট হয়। শঙ্খ ঘোষকেও 'হঠাৎ কেন ইকবাল?' প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, কিন্তু তাঁর কাজ ইকবালকে বাংলা পাঠকের কাছে পুনর্বিচার করেছে।

ইরফান হাবিবের পর্যবেক্ষণ: গজল থেকে দর্শন

ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব ইকবাল সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক মন্তব্য করেন: ইকবাল ফারসি ও উর্দু কবিতাকে নতুন ভাষা দিয়েছেন, শাস্ত্র ও সুফিবাদকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর লেখায় নিটশের গ্রেট ম্যান থিওরি, প্যান-ইসলামিজম, সোশ্যালিজম ও জাতীয়তাবাদের সম্মিলন ঘটেছে। হাবিবের মতে, ইকবাল গজলের রূপ বদলে দীর্ঘ কবিতার মেজাজ এনেছেন, যা 'নাজম কা মাসনাওয়ি' নামে পরিচিত। তাঁর কবিতা পুঁজিবাদ ও শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে। তবে, গজলের ঐতিহ্যবাহী রূপ হারিয়ে ফেলায় কিছু সমালোচনাও রয়েছে, কিন্তু তা ইকবালের মহত্ব ক্ষুণ্ন করে না।

দার্শনিক বনাম কবি: একটি বিভ্রান্তি

১৯৪৩ সালের একটি আলোচনা সভায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, হাবিবুর রহমান ও আবদুল হাকিম ইকবালকে কবি না বলে ইসলামী দার্শনিক ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হিসেবে বিবেচনা করেন। সৈয়দ আলী আহসান ও যতীন সরকার দেখিয়েছেন, ইকবালকে ইসলামের পুনরুজ্জীবনবাদী বা প্রগতিশীল কবি বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ইকবালের নোটবই অনুযায়ী, দর্শন হলো 'শীতল রাতে মানববুদ্ধির থর থর করে কাঁপতে থাকা একগুচ্ছ বিমূর্তন,' যা কবি উদ্দেশ্যমুখী করে তোলেন। তাঁর দর্শন-ঋদ্ধ কবিতা সমাজের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করেছে।

ইকবালের উত্তরাধিকার ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা

ইকবালের চিন্তায় স্ববিরোধিতা থাকলেও, তা রবীন্দ্রনাথ বা গ্যেটের মতো মহান প্রতিভাদের মতোই জটিল। তাঁর মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল জীবনকে সুস্থতর করা, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক আবেশে নয়। ১৯০৫-১৯০৮ সালের বিদেশবাস期间 তিনি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের কূটকৌশল পর্যবেক্ষণ করেন, যা তাঁর বঞ্চিত স্বজাতির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলে যায়। অমিয় চক্রবর্তীর মতে, ইকবালের কসমোপলিটান মন 'আধুনিকে-প্রাচীনে সমন্বয়' ঘটিয়েছে। আজ, শঙ্খ ঘোষের কাজের পর, আশা করা যায়, 'হঠাৎ কেন ইকবাল?' প্রশ্নের অবসান হবে, এবং তাঁর সামগ্রিক প্রতিভা স্বীকৃতি পাবে।